হুথিকে ইরানের নির্দেশ
হরমুজের পর লোহিত সাগরও বন্ধের হুমকি, চরম ঝুঁকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো বা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা চালালে লোহিত সাগরে তেল পরিবহনের রুট বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে ইরান। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া উচ্চপর্যায়ের অন্তত তিনটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগরে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আঞ্চলিক সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তেহরানের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং মিত্র হুথি গোষ্ঠীর কাছেও প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, হুথিদের কাছে সম্প্রতি এই বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে এটি কীভাবে পাঠানো হয়েছে কিংবা মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেওয়ার পরপরই নির্দেশটি দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেনি।
এ বিষয়ে রয়টার্স মন্তব্য জানতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হুথি গোষ্ঠীর মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বাব আল-মান্দেবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন
হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ইয়েমেনের হোদাইদাহ অঞ্চল থেকে এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী এলাকা এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করেছে হুথিরা। ওই সূত্রের দাবি, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন তারা কেবল ইরানের চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। এর আগে ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। নতুন এই পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে যদি হুথিরা লোহিত সাগরের জাহাজ বা বন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুটি তেল পরিবহন রুট একসঙ্গে অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনাও আরও বাড়তে পারে।
হুথিদের ঘনিষ্ঠ ওই সূত্র আরো জানায়, ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রতিনিধিরাই বাব আল-মান্দেব প্রণালি কখন বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে, অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই সোমবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে দেশটির বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। এর ফলে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে যায়।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক তরবজর্ন সলভড বলেন, হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যকার নতুন সংঘাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এসেছে। তার মতে, সংঘাত যদি আরো বিস্তৃত হয়ে লোহিত সাগরের রপ্তানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে প্রভাব ফেলে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথও পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে।
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও হুথিদের এই হুমকিকে সৌদি আরব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাদের মতে, লোহিত সাগর ইস্যুতে হুথি গোষ্ঠী এখন সরাসরি তেহরানের নির্দেশনা অনুসরণ করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর এই সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যে পথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। এরপর গত জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
