মাটির নিচেই ‘সেদ্ধ’ হচ্ছে আলু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র দাবদাহে দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। দেশটির কয়েকটি এলাকায় মাটি থেকে তোলার আগেই পচে যাচ্ছে আলু। অতিরিক্ত গরমে কিছু আলু এতটাই নরম হয়ে গেছে যে, সেগুলো দেখতে সেদ্ধ করা আলুর মতো মনে হচ্ছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকা গ্যাংওন প্রদেশের কৃষকেরা জানিয়েছেন, এক সপ্তাহ আগেও যেসব জমি স্বাভাবিক ও সুস্থ দেখাচ্ছিল, সেখানে এখন আলু তুলতে গিয়ে তেমন কোনো আলুই পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার সীমান্তের কাছে ইয়াংগু কাউন্টির হেয়ান এলাকায় আলু চাষ করেন লি সাং-হিয়ক। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসবিএসকে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু একটি-দুটি জমির ঘটনা নয়। বিষয়টি কীভাবে ভাষায় প্রকাশ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি।’
আরও পড়ুন: ইরানে হামলায় মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হাজারো সেনা ‘খাদ্য সংকটে’
৪০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন জানিয়ে লি সাং-হিয়ক বলেন, তাঁর দীর্ঘ কৃষিজীবনে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি।
শুধু আলু নয়, গরমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্যান্য সবজিও। একই এলাকার কয়েক হাজার পিয়ং জমিতে চাষ করা বাঁধাকপিও নষ্ট হয়ে গেছে। ‘পিয়ং’ কোরিয়ার প্রচলিত জমির পরিমাপের একটি একক, যা প্রায় ৩ দশমিক ৩ বর্গমিটারের সমান।
বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকেরা বাঁধাকপি তোলার সময় পিছিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই প্রচণ্ড গরমে জমিতেই সেগুলো পুড়ে ও পচে নষ্ট হয়ে যায়। কৃষকদের হিসাবে, নষ্ট হওয়া বাঁধাকপির সম্ভাব্য বাজারমূল্য কয়েক কোটি কোরীয় ওন, অর্থাৎ কয়েক হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ।
চলতি মাসে গ্যাংওন প্রদেশের চুনচন, হংচন ও হোয়ংসেং এলাকায় প্রথমবারের মতো তীব্র দাবদাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
অতিরিক্ত গরমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফলের বাগানও। আপেলের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে ‘সানবার্ন’ বা অতিরিক্ত সূর্যালোকে পোড়ে যাওয়ার সমস্যা। সরাসরি সূর্যের আলোয় থাকা আপেলের খোসা পুড়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত তাপে পিচফল ফেটে যাচ্ছে।
আপেলচাষি চন জং-থে এসবিএসকে বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চুসক উৎসবের সময় ফল সংগ্রহের উপযোগী করতে যেসব আপেলে রং ধরার কথা, সেগুলোর অনেকটির বৃদ্ধি থেমে গেছে। শুধু সূর্যের দিকে থাকা অংশ লাল হচ্ছে। দাবদাহ অব্যাহত থাকলে সেই অংশও বিবর্ণ হয়ে সাদা হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

আরও পড়ুন: ভারতকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে যা বললেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী
দক্ষিণ কোরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯ লাখের বেশি গবাদিপশু এবং খামারে পালন করা প্রায় ১৪ লাখ মাছ মারা গেছে।
গত ২ আগস্ট দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ইয়াংসান শহরে তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ১৯০৪ সালে আধুনিক পদ্ধতিতে তাপমাত্রা পরিমাপ শুরু হওয়ার পর এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। তুলনায়, যুক্তরাজ্যে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২২ সালের জুলাইয়ে লিংকনশায়ারের কনিংসবিতে এই তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
তীব্র গরমে শুধু ফসলই নয়, কৃষকেরাও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। অতিরিক্ত তাপে শারীরিক চাপ তৈরি হওয়ায় তাদের পক্ষে দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরের ভেতরে থাকার সরকারি পরামর্শও অনেক কৃষক মেনে চলতে পারছেন না।
পিচচাষি পার্ক ওয়ান-সন বলেন, ‘তারা আমাদের দিনের বেলা বাইরে গিয়ে কাজ না করতে বলছে। কিন্তু এই পিচগুলো তো পচে যাচ্ছে।’
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মন্ত্রিসভার সদস্যদের বলেছেন, দেশের মানুষ আগে কখনো এমন আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়নি। তিনি জাতীয় সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের চরম আবহাওয়া ধীরে ধীরে নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত তাপপ্রবাহের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব মূলত মানুষের মৃত্যু ও গবাদিপশুর প্রাণহানিকে ঘিরে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মোট পরিমাণ এখনো নিরূপণ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে কৃষকদের আশঙ্কা, ফসলের ব্যাপক ক্ষতির কারণে আগে থেকেই চড়া থাকা খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন দিনের শরৎকালীন ফসল উৎসব ‘চুসক’-এর আগে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই উৎসরকে কেন্দ্র করে পরিবারগুলো ছুটির দিনের খাবারের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য কিনে থাকে।
তীব্র গরমের জন্য আলুকে এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ফসল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। ২০২৪ সালে ‘পটেটো রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় লাইবনিজ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চ এবং ব্র্যান্ডেনবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিস্থিতি যেমনই হোক, দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রীষ্মকালীন আলু চাষের জন্য তাপসহনশীল জাতের প্রয়োজন হবে। তবে বসন্তকালীন আলু আরও আগে রোপণ করলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় এর আগেও তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি উঠেছে। পরে ঝড়ের কারণে দেশটির ভয়াবহ তাপপ্রবাহ থেকে সাময়িক স্বস্তি মিলেছিল।
এদিকে এশিয়ার অন্যান্য দেশেও তীব্র গরমের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। জাপানের কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি উঠেছে। দেশটিতে এ বছর প্রথমবারের মতো সরকারি স্বীকৃত ‘অত্যন্ত ভয়াবহ গরমের দিন’ রেকর্ড করা হয়েছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা এ বছর এই শ্রেণিবিন্যাস চালু করেছে।
হংকংয়েও তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, যা ১৮৮৪ সালে তাপমাত্রার রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর সেখানে সর্বোচ্চ।
চীনের শিনচিয়াং অঞ্চলের একটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে জুলাই মাসে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ ‘এশিয়ার জলবায়ুর অবস্থা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে এশিয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার তার আগের তিন দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ায় এবারের দাবদাহ শুধু একটি দেশের কৃষি ও জনজীবনের সংকট নয়, বরং এশিয়াজুড়ে ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়ারও একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
