চীন-পাকিস্তানকে মোকাবিলায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে নতুন পথে ভারত
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
ছবি : আল জাজিরা
চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রস্তুতি জোরদার করতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনছে ভারত। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) উদ্ভাবিত সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এর ফলে কারিগরি যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় সনদ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণকারী ভারতীয় বেসরকারি কোম্পানিগুলো ডিআরডিওর প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ পাবে।
আরও পড়ুন: ভারতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২ পাইলট
নয়াদিল্লির লক্ষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায় থেকে দ্রুত ব্যাপক উৎপাদনে যাওয়া, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশি অস্ত্র আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকেও প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করতে চায় ভারত।
সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থায় পরিবর্তন
এতদিন ডিআরডিওর তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই প্রধানত নির্ভরতা ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিক্স দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রায় একচেটিয়া ভূমিকা পালন করেছে।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক তাকশশীলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথনের মতে, নতুন সিদ্ধান্ত ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে। এতদিন বেসরকারি কোম্পানিগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করলেও এখন তারা পুরো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রধান উৎপাদক বা সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে।
আরও পড়ুন: নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ১৬২, নিখোঁজ প্রায় ৪০০
নতুন নীতির আওতায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য, অ্যান্টি-রেডিয়েশন ও অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি স্থলভাগে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কেন এখন এই সিদ্ধান্ত?
ভারত দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এ নীতিকে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নামে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে ভারতে উৎপাদন কারখানা স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সংঘাতের বিষয়টিও ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেটও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৪ সালে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বাজেট থেকে চলতি অর্থবছরে তা ৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।

গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতও ভারতের সামরিক প্রস্তুতিতে নতুন তাগিদ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাও ভারতের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষক রামানাথনের মতে, আধুনিক যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত খুব দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। শত্রুপক্ষের নির্ভুল হামলায় নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলায় বড় পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গড়ে তোলা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ক্ষেত্রে চীনকে ভারতের সবচেয়ে সক্ষম প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চীনকে প্রতিহত করতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর পাশাপাশি তা সহ্য করার মতো সক্ষমতাও ভারতের প্রয়োজন বলে মনে করছেন দেশটির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
বেসরকারি খাত কতটা প্রস্তুত?
ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প গত কয়েক বছরে দ্রুত বড় হয়েছে। ড্রোন, গোলাবারুদ, সামরিক ইলেকট্রনিকস ও মহাকাশ প্রযুক্তির পাশাপাশি এখন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনেও বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করছে।
জুনে ভারত দেশীয় নির্মাতাদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতির কথা জানায়। দেশটির ড্রোন শিল্পে ৬০০টির বেশি কোম্পানি যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে আদানি, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীও রয়েছে।
আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ২০২৪ সালে উত্তরপ্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
তবে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয় না। বিশ্লেষকদের মতে, এ উদ্যোগ সফল করতে হলে সরকারকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বড় আকারের ক্রয়াদেশ দিতে হবে। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ দরকার হবে।
ভারতের হাতে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র?
ভারতের হাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর কয়েকটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনেও সক্ষম।
দেশটির অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র অগ্নি-৫। এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এবং এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এ পাল্লার মধ্যে চীনের পুরো ভূখণ্ড, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের কিছু অংশ রয়েছে।
ভারতের অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে পৃথ্বী-১-এর পাল্লা প্রায় ১৫০ কিলোমিটার থেকে অগ্নি-৪-এর প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত।
এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতেও এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা জানিয়েছে ভারত।
অস্ত্র রপ্তানিতেও নজর
দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভারত সামরিক অস্ত্র রপ্তানিও বাড়াচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল মাত্র ৭২ মিলিয়ন ডলার, সাম্প্রতিক হিসাবে তা প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ভারতীয় কোম্পানিগুলো বিদেশি অস্ত্র নির্মাতাদের সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করছে। আদানি ডিফেন্স ইসরায়েলের এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে যৌথভাবে হের্মিস ৯০০ সশস্ত্র ড্রোন তৈরি করছে।
ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রও ভারতের রপ্তানি তালিকায় রয়েছে। ২০২২ সালে ফিলিপাইন তিন ব্যাটারি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র কেনে। পরে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও এ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে চুক্তি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও ব্রহ্মোস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।
সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স গড়ার চেষ্টা?
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য একটি শক্তিশালী ও বিস্তৃত দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি তৈরি করা। ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে যুদ্ধবিমান, কামান, গোলাবারুদ ও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে ভারত এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মতো পূর্ণাঙ্গ সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সে পরিণত হয়নি। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার বড় অংশ এখনো সরকারের হাতেই রয়েছে।
অস্ত্র আমদানিতে এখনো বড় নির্ভরতা
দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিকভাবে ভারত এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক।
এই সময়ে ভারতের আমদানি করা অস্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল রাশিয়া। দেশটি ভারতের মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করেছে।
প্রযুক্তি বেসরকারি হাতে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি?
ক্ষেপণাস্ত্রের মতো স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। বেসরকারি কোম্পানির সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সংরক্ষণ ও নজরদারি ব্যবস্থা সরকারি গোপন গবেষণাগারের তুলনায় দুর্বল হলে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে ভারতের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা বড় কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরেই প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করছে। তাদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষার অভিজ্ঞতাও রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ভারত সরকারও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি প্রতিপক্ষের হাতে চলে যাক, তা চায় না। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এমটিসিআর)-এর অধীনে ভারতের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি তথ্য ও প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ভারতের নতুন উদ্যোগকে শুধু বেসরকারি খাতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। চীন ও পাকিস্তানকে সামনে রেখে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন, বড় মজুত তৈরি, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং একটি শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে নয়াদিল্লি।
