নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিধ্বংসী বন্যায় সবশেষ মৃতের সংখ্যা ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিধ্বংসী বন্যায় সবশেষ মৃতের সংখ্যা ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধারকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) এ তথ্য জানিয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিধ্বংসী বন্যার পর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৪ হাজার জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এনডিআরআরএমএ জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি। এ ছাড়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মীও নিখোঁজ রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ফেডারেশন জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এই দুর্যোগে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাগুলো।
এর আগে, গত বুধবারের আকস্মিক বন্যায় নেপালে এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়।
আরও পড়ুন: ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে বাংলাদেশের বক্তব্যে যা বলছে ভারত
পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর তীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরে সেই পানির স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।
বন্যার প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যায়। নদীর স্রোতে মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মূল বন্যাকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় পৌঁছায়।
এখন রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসিতে মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ২২১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে।

যাদের জীবিত উদ্ধার করা গেছে, তাদের মধ্যে ৭৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন; তাদের মধ্যে রাসুয়ায় ৪৩, নুয়াকোটে ২৭ এবং ধাদিংয়ে তিনজন।
নিরাপত্তা ও সরকারি দায়িত্বে থাকা ১০৫ জনও নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫, পুলিশের ২৮, কাস্টমস কার্যালয়ের ১৫, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ এবং অভিবাসন কার্যালয়ের চারজন রয়েছেন।
তবে নিখোঁজের তালিকা এখনো চূড়ান্ত নয়। তালিকায় থাকা কেউ নিরাপদে অন্য কোথাও পৌঁছেছেন কি না, তা যাচাই করছে কর্তৃপক্ষ।
নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। মোট ১৪ হাজার ৮২৯ জন নিরাপত্তাকর্মীকে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ৬ হাজার ৬৯৮, পুলিশের ৪ হাজার ৪৭৩ এবং সশস্ত্র পুলিশের ৩ হাজার ৬৫৮ জন।
হেলিকপ্টারে করে ৩ হাজার ৭৪২ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; এ কাজে সেনাবাহিনী ও বেসরকারি অপারেটররা মিলে ৭৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
তবে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন বড় সংকট হয়ে উঠেছে উদ্ধার হওয়া মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা।
চিতওয়ানে দুই শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হলেও জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে রাখা সম্ভব ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ। এ কারণে ভারতপুরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব হবে।
নবলপরাসী পূর্ব জেলাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জায়গা না থাকায় সেখান থেকে মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে।
কাওয়াসোটির একটি কমিউনিটি ফরেস্ট হলও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পোখারায় তানাহুন, গোরখা, নাওয়ালপরাসি ইস্ট ও ধাদিং থেকে ৯৩টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে।
কাসকি জেলার হাসপাতালগুলোর সম্মিলিত মর্গের ধারণক্ষমতা ৮৮টি হওয়ায় সেখানেও ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।
মরদেহ শনাক্ত করতে পুলিশ ছবি তুলছে, আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করছে, ময়নাতদন্ত করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা নিচ্ছে। ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য কাঠমান্ডুর নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ও নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে।
যেসব মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না, সেগুলোর জন্যও কর্তৃপক্ষকে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুযায়ী নিরাপদ স্থানে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি মরদেহকে একটি নম্বর দেওয়া হবে এবং দাফনের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে পরে ডিএনএ বা অন্য কোনো প্রমাণের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হলে মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ভাটির এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে চিতওয়ানে ছুটে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিখোঁজ স্বজনের ছবি হাতে নিয়ে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রের কাছে অপেক্ষা করছেন।
এদিকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। ভূমিধসে নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে চীনের তিব্বত অংশে ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় হ্রদ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার সেই বাঁধ উপচে পড়ার খবরে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সরকার রাসুয়া ও নুয়াকোটকে তাৎক্ষণিক ১ কোটি নেপালি রুপি করে এবং ধাদিংকে ৫০ লাখ রুপি নগদ সহায়তা দিয়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ৩০টি ট্রাক ও চারটি বিমান কার্গো চালানও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রী ও সব মন্ত্রীর এক মাসের বেতন ও পারিশ্রমিক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
