×

আন্তর্জাতিক

ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যেই যৌথ ঘোষণা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো। ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরতে একমত হয়েছেন নেতারা। কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়ে এমন ভাষায় ঐকমত্যে পৌঁছানোকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর এনডিটিভির।

শুক্রবার থেকে নয়া দিল্লিতে শুরু হওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন চলবে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সম্মেলনের মূল আয়োজন হচ্ছে ভারত মণ্ডপমে। ভারতের সভাপতিত্বে এবারের সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও গ্লোবাল সাউথের ভূমিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে। 

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সম্মেলনের আবহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ছবি ঘিরে। ছবিতে মোদীকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হাত ধরে থাকতে দেখা যায়। একই ছবিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোকেও দেখা যায়।

ছবিটি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করে মোদী লিখেছেন, ‘BRICS Summit 2026 gets underway in Delhi’।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন শুক্রবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়া দিল্লিতে আসেন আজ শনিবার। ব্রিকস সম্মেলনের আগে মোদীর সঙ্গে পুতিনের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়। বৈঠকের পর দুই নেতা একই গাড়িতে করে ভারত মণ্ডপমে যান—যে দৃশ্যটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। 

এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণায়’ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষণায় সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আরও পড়ুন: ইরান-সমর্থিত হুথিরা ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ এগোচ্ছে, বিস্মিত পর্যবেক্ষকরা

বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘোষণাপত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি দায়ী না করে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসনে সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।

ঐকমত্যে পৌঁছানোই বড় সাফল্য

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, ব্রিকসের এবারের সম্মেলনের আগে যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ভাষা নিয়ে সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। এর আগে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও এ বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।


এদিকে, টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, নয়াদিল্লি সম্মেলনের আগে সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত শনিবার ভোর পর্যন্ত আলোচনা করে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছান তারা। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, তীব্র মতপার্থক্যের মধ্যেও ১১ সদস্যের জোটকে একটি যৌথ ঘোষণায় একমত করানো নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য।

পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ব্রিকসের মনোভাব

‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’তে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ঘোষণায় বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথাও বলা হয়েছে।

এ অবস্থান মূলত সংঘাতের সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের প্রতি ব্রিকসের আগ্রহকেই তুলে ধরেছে।

নির্দিষ্ট দেশের নাম না নেওয়ার কৌশল

ব্রিকসের যৌথ ঘোষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো নির্দিষ্ট দেশকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসন’ ও একতরফা যুদ্ধের বিরোধিতা করা। এর ফলে একই জোটে থাকা পরস্পরবিরোধী অবস্থানের দেশগুলোও একটি অভিন্ন ভাষায় সম্মত হতে পেরেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ব্রিকসের বর্তমান বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করে। জোটে এখন ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের ভিন্ন অবস্থানের দেশ রয়েছে। ফলে কোনো একটি পক্ষের পক্ষে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে তুলনামূলকভাবে সাধারণ ও নীতিনির্ভর ভাষা বেছে নেওয়া হয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান

ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের সব ধরনের রূপ ও প্রকাশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরে এর অর্থায়ন, আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলারও নিন্দা জানানো হয়েছে।

ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন ও কঠোর অবস্থানের দাবি জানিয়ে আসছে। এবারের ঘোষণায় চীন ও রাশিয়াসহ ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সমর্থন পাওয়া ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যযুদ্ধ ও একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা

শুধু যুদ্ধ ও নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়েও অবস্থান জানিয়েছে ব্রিকস। ঘোষণায় একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার সমালোচনা করা হয়েছে। সদস্য দেশগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং ইরান ও রাশিয়ার ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিকস দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা-নির্ভর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বহুপক্ষীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

আরও পড়ুন: যেভাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা

এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, বহুপক্ষীয়তা জোরদার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনে ব্রিকসকে কোনোভাবেই পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য কতটা?

এবারের সম্মেলনের আয়োজক ও বর্তমান ব্রিকস চেয়ার ভারত। পশ্চিম এশিয়ায় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে, একই সময়ে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ভিন্ন অবস্থানের দেশগুলোকে একই ঘোষণায় সম্মত করানো নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে সম্মেলনের আগে যখন যৌথ ঘোষণাপত্র নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখন শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো ভারতের মধ্যস্থতামূলক কূটনৈতিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সেই পরীক্ষায় ভারতের সফলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে ঘোষণায় নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা পক্ষের নাম না থাকায় এর বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের ভেতরে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ভবিষ্যতেও জোটটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

ব্রিকসের চ্যালেঞ্জ

ব্রিকস এখন আগের তুলনায় অনেক বড় ও বৈচিত্র্যময় একটি জোট। অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ এক নয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার পরিবর্তন—সবকিছুই জোটের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের জন্য বড় পরীক্ষা।

তারপরও নয়াদিল্লি ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিকস অন্তত একটি বিষয়ে অভিন্ন বার্তা দিতে পেরেছে—আন্তর্জাতিক সংঘাতের সমাধান সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার পথেই হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছে জোটটি।

ফলে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ শুধু একটি যৌথ বিবৃতি নয়; পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে ব্রিকস নিজেদের ভূমিকা কীভাবে দেখতে চায়—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নাচের কথা বলে নৌকায় নিয়ে দুই নৃত্যশিল্পীকে ধর্ষণ!

নাচের কথা বলে নৌকায় নিয়ে দুই নৃত্যশিল্পীকে ধর্ষণ!

‘বাবা-মাকে সুরক্ষা দিতে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধনী’

আইনমন্ত্রী ‘বাবা-মাকে সুরক্ষা দিতে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সংশোধনী’

পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনের পরই ৭ এসআরও, অনলাইনে হবে বেতন নির্ধারণ

পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনের পরই ৭ এসআরও, অনলাইনে হবে বেতন নির্ধারণ

ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা

ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App