ইন্দোনেশিয়ার নৌবহরে প্রথম বিমানবাহী রণতরী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রথমবারের মতো ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে একটি বিমানবাহী রণতরী। ৪১ বছর বয়সী সাবেক ইতালীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ‘জুসেপ্পে গারিবালদি’ এখন ইন্দোনেশিয়ার নৌবহরের অংশ। দেশটির নৌবাহিনী জাহাজটির নতুন নাম দিয়েছে ‘কেআরআই শ্রীবিজয়া’। খবর এএফপি’র।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জাকার্তার তানজুং প্রিয়ক বন্দরে জাহাজটির আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠান হয়। ইতালি থেকে যাত্রা করে কলম্বো ও মালাক্কা প্রণালি হয়ে ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছায় এটি। এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর জাহাজটি ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করলে দুটি ফ্রিগেট ও নৌবাহিনীর বিমান সেটিকে জাকার্তা পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট ইতালির তারান্তো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি প্রায় ৬ হাজার ৮৭০ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে। পথে সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে এটি মালাক্কা প্রণালি দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করে।
জাহাজটি ১৯৮৫ সালে ইতালীয় নৌবাহিনীতে কমিশন করা হয়েছিল। ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই রণতরি সর্বোচ্চ ১৮টি হেলিকপ্টার এবং প্রায় ৮৩০ জন সদস্য বহন করতে পারে। ইন্দোনেশীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় জাহাজটির বর্তমান অবস্থা ভালো বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর প্রধান মুহাম্মদ আলী বলেন, দেশটিতে নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ায় বিপুলসংখ্যক হেলিকপ্টার বহনে সক্ষম এমন একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন ছিল। দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে জাহাজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে জুমার নামাজ চলাকালে মসজিদে বোমা হামলা, নিহত ১৬
ইন্দোনেশীয় নৌবাহিনী জানিয়েছে, কেআরআই শ্রীবিজয়া মূলত দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা ও দুর্গম এলাকায় লজিস্টিক সহায়তার কাজে ব্যবহৃত হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে প্রতিরক্ষা অভিযানেও জাহাজটি মোতায়েন করা যেতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির ফ্লাইট ডেকে একসঙ্গে চারটি হেলিকপ্টার ওঠানামার সুবিধা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার নৌ, বিমান ও স্থলবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্রুরা ইতোমধ্যে জাহাজটিতে পরিচালনা ও অবতরণের প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। এর মাধ্যমে নতুন প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তবে জাহাজটি ইন্দোনেশিয়ার নৌবহরে যুক্ত হওয়া নিয়ে খরচ ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের জন্য ৪৫ কোটি ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। ভবিষ্যতে সংস্কার ও আধুনিকায়নে আরও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হতে পারে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সাবমেরিন ও ফ্রিগেটের মতো অন্যান্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতার তুলনায় বিমানবাহী এই রণতরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও প্রশ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাবার্তার জবাব দিলেন নরেন্দ্র মোদি
তবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তোর সরকার ইন্দোনেশিয়ার পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়ন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২২ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রাবোয়োর অধীনে ফ্রান্সের সঙ্গে ৮১০ কোটি ডলারের চুক্তি করে জাকার্তা। এর আওতায় ৪২টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার কথা রয়েছে; মে মাস পর্যন্ত ছয়টি বিমান সরবরাহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ফ্রান্সের নাভাল গ্রুপের কাছ থেকে দুটি স্করপেন শ্রেণির সাবমেরিন কেনার চুক্তি করেছে। ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইন্দোনেশিয়া সফরের সময় ভারত দেশটিকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করছে জাকার্তা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কমন সিকিউরিটি ট্রিটি সই করেছে ইন্দোনেশিয়া। চুক্তির আওতায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও যৌথ প্রশিক্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ায় যৌথ প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তার বিষয়টি রয়েছে।
এভাবে একদিকে দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক সহায়তার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য, অন্যদিকে সামরিক আধুনিকায়নের বৃহত্তর পরিকল্পনা—দুই দিক থেকেই ইন্দোনেশিয়ার নৌবহরে কেআরআই শ্রীবিজয়ার অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
