দৌলতপুরের নীলকুঠি- নির্যাতনের স্মৃতি পেরিয়ে আজ জনসেবার ঠিকানা
নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাকুন্ডি গ্রামে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক নীলকুঠি। অসংখ্য মানুষের কান্না, কৃষকের আর্তনাদ, লাঠিয়ালদের বুটের শব্দ এবং নীলকরদের নিষ্ঠুরতার নীরব সাক্ষী এই ভবন।
আজ সেখানে আর শোনা যায় না চাবুকের শব্দ কিংবা নির্যাতিত কৃষকের আহাজারি। বরং প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন জমির খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর এবং অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে।
ইতিহাসের নির্মম অতীতকে পেছনে ফেলে জনসেবার নতুন পরিচয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাকুন্ডি গ্রামের এই ঐতিহাসিক নীলকুঠি। বাংলার নীল বিদ্রোহ, কৃষকের রক্তে রঞ্জিত সংগ্রাম এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মম অধ্যায়ের জীবন্ত স্মারক হিসেবে আজও এটি স্থানীয় মানুষের কাছে ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি, ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮০০ সালের দিকে চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত ছয় কক্ষবিশিষ্ট এই ভবনটি ছিল ব্রিটিশ নীলকরদের অন্যতম প্রশাসনিক কেন্দ্র। ভবনের চারপাশে আজও দাঁড়িয়ে থাকা সাতটি প্রাচীন দেবদারু গাছ যেন সময়ের প্রহরী হয়ে অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে। বাতাসে দুলতে থাকা সেই গাছগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, তারা যেন এখনও শুনতে পায় দুই শতক আগের মানুষের আর্তচিৎকার।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপে প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৭৭৭ সালের পর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে অসংখ্য নীলকুঠি। উর্বর মাটি, পদ্মা নদীর নৌপথ এবং কৃষি উপযোগী পরিবেশের কারণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরও নীল উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কিন্তু এই নীল ছিল না উন্নয়নের প্রতীক; ছিল শোষণ ও নির্যাতনের অন্য নাম। ইতিহাসবিদদের মতে, কৃষকদের সামান্য অগ্রিম অর্থ বা ‘দাদন’ দেওয়া হতো। প্রথমে সেটিকে সহায়তা মনে হলেও পরে তা পরিণত হতো শোষণের ফাঁদে। খাদ্যশস্যের পরিবর্তে কৃষকদের বাধ্য করা হতো নীল চাষে। অস্বীকৃতি জানালেই নেমে আসত অমানবিক নির্যাতন। লাঠিয়াল বাহিনীর হামলা, কৃষকদের বেঁধে নির্যাতন, ঘরবাড়ি ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ ছিল নীলকরদের অত্যাচারের নিত্যদিনের চিত্র।
এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক একসময় রুখে দাঁড়ান। ১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ শুধু একটি কৃষক আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের এক অনন্য প্রকাশ। সেই আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে চলেছে দৌলতপুরের এই নীলকুঠিও।
সময়ের প্রবাহে বদলে গেছে ইতিহাসের সেই নিষ্ঠুর অধ্যায়। যে ভবনে একসময় কৃষকদের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন নীলকররা, সেই ভবনেই এখন পরিচালিত হচ্ছে হোগলবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। প্রতিদিন ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে সাধারণ মানুষ আসছেন এখানে। যে স্থানে একদিন কৃষকেরা ভয়ে কাঁপতেন, আজ সেই স্থানই কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করার সরকারি দপ্তর।
তবে সময়ের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে প্রায় দুই শতকের পুরোনো এই স্থাপনাটি। ছাদের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং কয়েকটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূল কাঠামো এখনও টিকে থাকলেও দ্রুত সংস্কার না হলে ইতিহাসের এই অমূল্য নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা যায়, একসময় দৌলতপুর উপজেলার মহিষকুন্ডি, পচামাদিয়া ও হোসেনাবাদ এলাকাতেও নীলকুঠি ছিল। সেখান থেকেও পরিচালিত হতো নীলের ব্যবসা। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে একে একে বিলীন হয়ে গেছে সেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা। বর্তমানে হোসেনাবাদ ও মহিষকুন্ডিতে নতুন ভবনে ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিচালিত হলেও ইতিহাসের সেই ভবনগুলো আর টিকে নেই। প্রবীণদের স্মৃতি আর কিছু ধ্বংসাবশেষই কেবল অতীতের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তানভির কবির বলেন, “দৌলতপুরের এই নীলকুঠি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে এটি ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।”
হোসেনাবাদ গ্রামের প্রবীণ আব্দুল মান্নান বলেন, “ছোটবেলায় বাবার মুখে ইংরেজদের অত্যাচারের অনেক গল্প শুনেছি। তখন এই জায়গার নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। আজ সেই জায়গাতেই ইউনিয়ন ভূমি অফিস। আগে যেখানে কৃষকদের ওপর নির্যাতন হতো, এখন সেখানে কৃষকেরা নিজেদের জমির কাগজপত্রের কাজ করেন এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করেন। সময় সত্যিই অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।”
দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, “বর্তমানে ভবনটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। উপজেলার চারটি নীলকুঠির মধ্যে তিনটি স্থানে বর্তমানে ভূমি অফিস পরিচালিত হচ্ছে।”
ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা টিকে থাকে ইট-পাথর, গাছপালা, স্থাপত্য আর মানুষের স্মৃতির ভাঁজে। দৌলতপুরের এই নীলকুঠি তেমনই এক নীরব ইতিহাস, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক শোষণের কালো অধ্যায়, কৃষকের আত্মত্যাগ এবং সময়ের অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের কথা।
আজ এই ভবন শুধু একটি সরকারি দপ্তর নয়; এটি অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য সেতুবন্ধন। যে দেয়াল একদিন নিপীড়নের প্রতীক ছিল, সেই দেয়ালই আজ মানুষের অধিকার ও সেবার আশ্রয়স্থল। তাই ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় নিয়ে দৌলতপুরের এই দুই শতাব্দী প্রাচীন নীলকুঠিকে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
