ভোরের কাগজে সংবাদ প্রকাশ
খাল খননে অনিয়ম, দেড় কোটি টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হল প্রশাসন
বাবুল আকতার, খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
খুলনার ডুমুরিয়ায় দুই খাল খননে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগের খবর ভোরের কাগজে প্রকাশের পর শেষ পর্যন্ত সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ ও জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এ অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, পানি অপসারণ না করে ভেক্যু দিয়ে পেড়ি মাটি উত্তোলন, ২ খাল খননে অনিয়ম ও জলাবদ্ধতা নিরসন অনিশ্চিতের খবরে বিভাগীয় কমিশনার ২ দফা মুঠোফোনে কথা বলার পর সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার। গত ১৩ আগস্ট জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে এক লিখিত পত্রের মাধ্যমে অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিলে তিনি এই অর্থ জমা দেন।
আরও পড়ুন: সার না পেয়ে গুদামের দরজা ভেঙে ১০ হাজার কেজি সার নিয়ে গেল কৃষক
তবে এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টাকা ফেরত না দিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কয়েক দফা চিঠি দিয়ে ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। অন্যদিকে সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া খাল হয়ে ভদ্রা নদী অভিমুখে খাল পুনঃখনন’ প্রকল্পের ভদ্রা নদীর নষ্ট হয়ে যাওয়া স্লুইজ গেটের সামনে মাটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। নামমাত্র একটি বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়েছে। যার দক্ষিণ পাশেও পানি। মাঝখানের বেড়িতে চারা রোপণকৃত চারা এখন পানির নিচে। এ ঘটনায় দুর্নীতিবাজ ইউএনওর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন উপজেলাবাসী।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খুলনা ডুমুরিয়া উপজেলার ৩টি খাল অগ্রাধিকার দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। এ ৩টি খালের মধ্যে ২টি খাল পুনঃখননের অনুমোদন দেওয়া হয়। কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা দক্ষিণপাশের ৮০ ফুট পর্যন্ত খাল পুনঃখনন, যার দৈর্ঘ্য ৭ কিলোমিটার। খালটির পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখ ১১ হাজার ৮৪৩ টাকা। এর মধ্যে ৩৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা শ্রমিকদের বিভিন্ন কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৯০ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৩ টাকা আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ। অন্যদিকে সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানে হয়ে তেলিখালী গেট অভিমুখে ভদ্রা নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন। এ কাজের আর্থিক বাজেট ধরা হয় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা। যার মধ্যে শ্রমিকদের কাজের জন্য বরাদ্দ ৬৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ৬৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অর্থায়নে ইজিপিপি অর্থাৎ অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন খাল ২টির পুনঃখননের কার্যক্রম শুরু করেন।
তবে খালের পানি অপসারণ না করে ভাসমান ভেক্যু দিয়ে পেড়ি মাটি তুলে ফেলে খালের পাড়েই। যে কারণে আবারও পানিবন্দী হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয় ডুমুরিয়া উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। এতে ফুঁসে ওঠে উপজেলাবাসী। বিলডাকাতিয়ার নিমতলা খাল খননের কাজ ৫০ ভাগ শেষ হলেও কাগজ কলমে ৭১ ভাগ দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে দ্রুত জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন দাখিল করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ফলে এই প্রকল্পে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৯১ হাজার ৮শ ৪৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও জলাবদ্ধতা নিরসন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচি এ অঞ্চলে কোনো সুফলই আসছে না।
এ ঘটনায় প্রকল্পের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। শ্রমিকদের কাজে না নিয়ে বরাদ্দকৃত ১ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৫শ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করেন উপজেলাবাসী। এ খাল খনন কাজ পরিদর্শনে এসেছিলেন ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিনাক্ষী ব্রম্ম। তিনি প্রকল্প কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে নকশা অনুযায়ী ও পানি অপসারণ করে খাল খননের নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশ অনুযায়ী উপজেলা প্রশাসন খাল পুনঃখননের কাজ করতে ব্যর্থ হয়। সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া খাল হয়ে ভদ্রা নদী অভিমুখে খাল পুনঃখনন’ প্রকল্পের ভদ্রা নদীর নষ্ট হয়ে যাওয়া স্লুইজ গেটের সামনে মাটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। নামমাত্র একটি বেড়িবাঁধ দেওয়া হয়েছে। যার দক্ষিণ পাশেও পানি। এর মাঝখানের বেড়িতে চারা রোপণকৃত চারা এখন পানির নিচে।
একটি খাল খননের কাজ কাগজ কলমে ৭১ ভাগ, অপরটি শতভাগ দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে দ্রুত জেলা প্রশাসকের দপ্তরে প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন দাখিল করা। ডুমুরিয়ার এ খাল দুটি পুনঃখননের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য নির্বাহী অফিসার কয়েক দফা লিখিত পত্র পাঠান জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। ডুমুরিয়া উপজেলার ২ খাল পুনঃখননের সার্বিক পরিস্থিতি ও নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ গত ৭ জুলাই ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর নড়ে চড়ে বসে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন। দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে দুই দফা মুঠোফোনে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আবদুল্লাহ হারুন। এসময় তিনি ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকারকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। পরবর্তীতে ডুমুরিয়া উপজেলার দুটি খাল খনন প্রকল্পের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য গত ১৩ আগস্ট জেলা প্রশাসকের দপ্তরের এক পত্রের মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নির্দেশ পাওয়ার পর ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়া এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য দুটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যার মধ্যে সাহস ডোলডাঙ্গা খাল হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া খাল হয়ে ভদ্রা নদী অভিমুখে খাল পুনঃখনন’ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। খাতা-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯০ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। এছাড়া বিলডাকাতিয়ায় খনন করা খালের পাড়ে দেওয়া মাটির অধিকাংশ স্থানে অস্তিত্ব নেই। অপরদিকে ডুমুরিয়া ফুলতলা এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা বিলডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা। বিলডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া ’কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিলডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা পর্যন্ত খাল পুনঃখনন’ প্রকল্পে ১ কোটি ৮০ লাখ ২৮ হাজার ২৩২ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮২ লাখ ২১ হাজার ৫৭৪ টাকা। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিতে হয়েছে ৯৮ লাখ ৬০ হাজার ৬৫৮ টাকা।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আরিফ হোসেন জানান, ডুমুরিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য দুটি খাল খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকারের নিকট টেলিফোনে জানাতে চাইলে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি একটি মিটিংয়ে থাকায় এর বেশি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
খুলনা জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল করিম বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার দুটি খাল খননের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে সেটি সরেজমিনে দেখে সে অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অবশিষ্ট টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ অনুযায়ী ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন অব্যয়িত অর্থ কোষাগারে জমা দিয়েছে।
