‘নতুন শর্তে এমপিওভুক্তদের আইনগত অধিকার বঞ্চিত করা যাবে না’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৪ পিএম
ফাইল ছবি
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময়কার বিধিমালা উপেক্ষা করে পরবর্তী সময়ে প্রণীত কোনো শর্ত বা বিধি অতীত থেকে কার্যকর দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্জিত আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এমপিও সংক্রান্ত চার শিক্ষকের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। ‘মো. আবু হানিফ ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় হাইকোর্ট এ পর্যবেক্ষণ দেন।
গত ৩০ জুন বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত হয়েছে। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি উর্মি রহমান মূল রায়টি লেখেন।
আরো পড়ুন: ডন কারাগারে, আদালতে যা বলল রাষ্ট্রপক্ষ
রিটকারীদের পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. আতাউর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ওয়ালিউল ইসলাম অলি ও মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রবিধান (রেগুলেশন ২০১৫) অনুসরণ করে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রোজি মোজাম্মেল মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগে প্রভাষক (তৃতীয় শিক্ষক) পদে মো. আবু হানিফসহ চারজনকে ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিয়োগ দেওয়া হয়। পরদিন, ৩০ ডিসেম্বর তারা নিজ নিজ পদে যোগদান করেন।
পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এনটিআরসিএ পরিপত্র জারির আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রকাশিত ৭২৬ জন শিক্ষকের তালিকায় এই চার শিক্ষকের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় তাদের এমপিও আবেদন ‘NTRCA সনদ নেই’—এই কারণ দেখিয়ে নামঞ্জুর করা হয়।
পরে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন চার শিক্ষক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রশাসনিক প্রয়োজনে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাকরির বিধিমালা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে করা এমন পরিবর্তন ইতোপূর্বে চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মচারীর অর্জিত অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করতে পারে না।
আদালত বলেন, চার শিক্ষককে যখন ২০১৫ সালে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় এনটিআরসিএ সনদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এনটিআরসিএ সনদের শর্ত প্রথমবারের মতো ২০১৯ সালের প্রবিধানে যুক্ত করা হয়।
ফলে নিয়োগের সময় বিদ্যমান বিধিমালা অনুসারে বৈধভাবে চাকরিতে যোগ দেওয়া শিক্ষকদের ওপর পরবর্তী সময়ে প্রণীত শর্ত আরোপ করে তাদের অর্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আইনসঙ্গত নয় বলে মত দেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোয় নেই—এমন দাবি করা হলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। হাইকোর্ট বলেন, সরকার নিজেই বিভিন্ন সময়ে একাধিক পরিপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোয় নেই—রাষ্ট্রপক্ষের এমন দাবির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
আদালত আরও বলেন, এমপিও মঞ্জুর করা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে যুক্তিসংগত আইনগত ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশি বা স্বেচ্ছাচারীভাবে এমপিও সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
চূড়ান্ত রায়ে এনটিআরসিএ সনদ না থাকার অজুহাতে চার প্রভাষকের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যানের অনলাইন সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে রিটকারী চার শিক্ষককে এমপিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে প্রাপ্য সব বকেয়াসহ আর্থিক সুবিধা চার রিটকারীকে পরিশোধ করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
