হুমায়ূন আহমেদ, পাঠকের হৃদয়ে চিরকালীন গল্পের জাদুকর
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৩০ পিএম
বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। ছবি : সংগৃহীত
বৃষ্টি ছিল তার আজীবনের ভালোবাসা। বর্ষার মেঘ, টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, কদমফুলের সুবাস আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতা বারবার ফিরে এসেছে তার গল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র ও গানে। বৃষ্টিকে তিনি শুধু ঋতুর সৌন্দর্য হিসেবে দেখেননি, বরং ভালোবাসা, অপেক্ষা, বিচ্ছেদ ও জীবনের গভীর অনুভূতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। হয়তো সে কারণেই মৃত্যুর পরও বর্ষা এলেই বাংলা ভাষার পাঠক-দর্শকদের মনে নতুন করে ফিরে আসেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ।
রোববার (১৯ জুলাই) বাংলা সাহিত্যের এই কিংবদন্তির ১৪তম প্রয়াণবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি চলে গেলেও তার সৃষ্টি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে বেঁচে আছে।
নিজের লেখা গানেই তিনি একসময় লিখেছিলেন, ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো এক বরষায়।’ সেই গান যেন আজও তার ভক্তদের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, বর্ষা নামলেই স্মৃতির জানালা খুলে তিনি ফিরে আসেন তার প্রিয় নুহাশ পল্লীর সবুজে, ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়া’য় কিংবা পাঠকের বুকের গভীরে।
হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে। তার বাবা শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়, কারণ বাবার চাকরির সূত্রে পরিবারের স্থান পরিবর্তন করতে হতো।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। দেশে ফিরে দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তবে লেখালেখির জনপ্রিয়তা এতটাই ব্যাপক হয়ে ওঠে যে একসময় অধ্যাপনা ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্য ও নির্মাণকাজে মনোনিবেশ করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। প্রথম বই দিয়েই সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি। এরপর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কথাশিল্পী হিসেবে।
পরবর্তী চার দশকে তিনি লিখেছেন দুই শতাধিক গ্রন্থ। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘দেয়াল’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘কবি’, ‘লীলাবতী’, ‘গৌরীপুর জংশন’, ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘নীল মানুষ’, ‘আমার আছে জল’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সৃষ্টি।
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্বগুলোর একটি হলো বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করা, যেগুলো বাস্তব মানুষের মতোই পাঠকের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। হিমু—হলুদ পাঞ্জাবি পরা রহস্যময় তরুণ, যে খালি পায়ে শহরের রাস্তায় হাঁটে এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখে। মিসির আলি—যুক্তিবাদী, মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষক এবং রহস্যভেদে পারদর্শী এক অধ্যাপক, যিনি অলৌকিক ঘটনাকেও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। শুভ্র—স্বচ্ছ, নির্মল ও সংবেদনশীল এক চরিত্র, যার মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন মানবিকতার ভিন্ন রূপ। এছাড়া রূপা, বাকের ভাই, মজনু, কুট্টি, আবেদ আলীসহ তার অসংখ্য চরিত্র পাঠকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
শুধু সাহিত্য নয়, বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসেও হুমায়ূন আহমেদের অবদান অনন্য। তার রচিত ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’—এসব ধারাবাহিক নাটক আজও দর্শকদের কাছে কালজয়ী। বিশেষ করে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে চরিত্রটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ বিক্ষোভ পর্যন্ত করেছিল—যা বাংলা নাটকের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
পরবর্তীতে তিনি নিজেই নির্মাণ করেন *‘নক্ষত্রের রাত’, ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’, ‘সেদিন চৈত্র মাস’, ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’, ‘সমুদ্র বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘হাবলঙ্গের বাজারে’, ‘তারা তিনজন’, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’সহ বহু জনপ্রিয় নাটক।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সফল। তার পরিচালিত ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের নতুন মাত্রা যোগ করে। এরপর তিনি নির্মাণ করেন ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। এর মধ্যে একাধিক চলচ্চিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এবং দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়।
আরো পড়ুন : দাম্পত্য জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন গুলতেকিন
গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত নুহাশ পল্লী ছিল হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয় স্থান। প্রকৃতি, বৃক্ষ, জলাশয়, পাখি ও শিল্পের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক স্বপ্নের জগৎ। এখানেই তিনি অসংখ্য নাটক ও চলচ্চিত্রের শুটিং করেছেন। মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী নুহাশ পল্লীতেই তাকে সমাহিত করা হয়।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদক, একুশে পদকসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা।
চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন বিভাগে আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর একটি একুশে পদক লাভ করেন।
হুমায়ূন আহমেদ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার গল্পের হিমু এখনও শহরের পথে হেঁটে বেড়ায়, মিসির আলি এখনও রহস্যের সমাধান খোঁজেন, বাকের ভাই এখনও দর্শকের আবেগে বেঁচে আছেন, আর তার লেখা বই এখনও নতুন প্রজন্মের হাতে হাতে ঘুরে বেড়ায়।
বর্ষার প্রতিটি বৃষ্টিভেজা দিনে, জোছনাভরা প্রতিটি রাতে এবং বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তাই বারবার ফিরে আসে একটি নাম—হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি কেবল একজন লেখক নন; তিনি এক অনন্য সাহিত্যজগতের নির্মাতা, যার সৃষ্টি সময় পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।
