জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ ১০ আমল, জানুন ফজিলত
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামে জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মুসলমানদের জন্য এটি সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে পরিচিত। এ দিনে নামাজের পাশাপাশি কিছু সুন্নত ও নফল আমল করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে। কোরআন-হাদিসে জুমার দিনের বিশেষ কিছু আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। জুমার দিনকে ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে কাজে লাগানো প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই কল্যাণকর।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা আল-জুমুআ: ৯)
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি আমল তুলে ধরা হলো
১. নখ কাটা ও পরিচ্ছন্ন থাকা
জুমার দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উত্তম। নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা এবং শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা ইসলামের ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত। তাই জুমার নামাজের প্রস্তুতি হিসেবে নিজেকে পরিপাটি রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতি আমল। (সহিহ বুখারি: ৫৮৮৯)
২. জুমার দিন গোসল করা
জুমার নামাজের আগে গোসল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের কেউ যখন জুমার নামাজে আসার ইচ্ছা করে, সে যেন গোসল করে।’ (সহিহ মুসলিম: ৮৪৪)
গোসলের মাধ্যমে শরীর পরিচ্ছন্ন ও সতেজ রাখার পাশাপাশি মসজিদে অন্য মুসল্লিদের জন্যও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়।
৩. পরিষ্কার পোশাক, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহার
জুমার দিন পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরা, মিসওয়াক করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম। হাদিসে জুমার দিনের প্রস্তুতিতে গোসল, মিসওয়াক ও সুগন্ধি ব্যবহারের কথা এসেছে। (সহিহ বুখারি: ৮৮০)
তবে সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্য মুসল্লিদের অসুবিধা হয়—এমন অতিরিক্ত তীব্র সুগন্ধি এড়িয়ে চলা উচিত।
৪. সুরা কাহফ তিলাওয়াত
জুমার দিনে সুরা কাহফ তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলতের কথা বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনায় পাওয়া যায়। হাদিসে জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠের মাধ্যমে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর লাভের কথা বর্ণিত হয়েছে। (মুস্তাদরাকে হাকিম: ৩৩৯২)
তাই জুমার দিনে সুযোগ করে সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা একটি উত্তম আমল।
৫. বেশি বেশি দরুদ পাঠ
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিন সর্বোত্তম দিনগুলোর একটি এবং এ দিনে তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে বলা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)
তাই জুমার দিন বিশেষভাবে দরুদ শরিফ পাঠের অভ্যাস করা উচিত।
৬. মসজিদে আগেভাগে যাওয়া
জুমার নামাজের জন্য আগে আগে মসজিদে যাওয়া বড় ফজিলতের আমল। সহিহ হাদিসে এসেছে, জুমার দিন ফেরেশতারা মসজিদের দরজায় অবস্থান করে আগত মুসল্লিদের নাম ক্রমানুসারে লিখতে থাকেন। যারা আগে আসে, তাদের জন্য বিশেষ সওয়াবের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৮৮১)
ইমাম খুতবার জন্য বের হলে ফেরেশতারা তাঁদের তালিকা বন্ধ করে খুতবা শুনতে থাকেন। তাই সম্ভব হলে খুতবার আগেই মসজিদে পৌঁছানো উচিত।
৭. সম্ভব হলে হেঁটে মসজিদে যাওয়া
জুমার নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া উত্তম। হাদিসে মসজিদের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য সওয়াব এবং গুনাহ মাফের ফজিলতের কথা এসেছে। (সহিহ মুসলিম: ৬৬৬)
তবে দূরত্ব, শারীরিক সক্ষমতা বা অন্য কোনো বাস্তব কারণে হাঁটা সম্ভব না হলে যানবাহনে যাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।
৮. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা
জুমার খুতবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় মনোযোগ দিয়ে তা শোনা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় কেউ যদি পাশের ব্যক্তিকে ‘চুপ করো’ বলে, তাহলেও সে অনর্থক কাজে লিপ্ত হলো। (সহিহ বুখারি: ৯৩৪)
তাই খুতবার সময় মোবাইল ব্যবহার, গল্প করা বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত না থেকে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা উচিত।
৯. জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায়
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুমার নামাজ আদায় করা। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও শরিয়তসম্মতভাবে জুমার জন্য দায়িত্বশীল মুসলিম পুরুষের জন্য জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সুরা আল-জুমুআ: ৯)
তাই জুমার নামাজকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।
১০. দোয়া কবুলের বিশেষ সময় খোঁজা
জুমার দিনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এ দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন আল্লাহর কাছে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ আশা করা যায়। এ সময়টি নির্ধারণের বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগের সময়কে এ বিশেষ সময় হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। (সহিহ বুখারি: ৯৩৫)
অন্য বর্ণনায় আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগের সময়ের প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৮)
তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসরের পর বেশি বেশি দোয়া, জিকির ও ইস্তিগফারে সময় দেওয়া উত্তম।
জুমার দিন শুধু নামাজ আদায়ের দিন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর স্মরণ, দরুদ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও নেক আমল বাড়ানোর একটি বিশেষ সুযোগ। পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে মসজিদে আগে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং জুমার নামাজ আদায় প্রতিটি আমলই একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই সপ্তাহের এই মর্যাদাপূর্ণ দিনটিকে অযথা কাজে নষ্ট না করে কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ইবাদত ও নেক আমলে কাটানোর চেষ্টা করা উচিত। বিশেষ করে জুমার নামাজ আদায়ের পাশাপাশি বেশি বেশি দরুদ পাঠ, সুরা কাহফ তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে দিনটি বরকতময় করে তোলা যেতে পারে।
