যেসব কারণে জোট গঠন করলো সৌদি আরব
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশকে জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদ।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রাথমিকভাবে ১৩টি দেশ এই জোটে অংশ নিতে সম্মতি দিয়েছে। প্রস্তাবিত জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে স্থাপন করা হবে।
কেন এই জোট?
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে গত ২০ জুলাই ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে জলপথ অবরোধের ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে টোল বা শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কোন কোন দেশ যোগ দিচ্ছে?
সৌদি আরবের পাশাপাশি জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান এবং কোমোরাস।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেয়নি। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেওয়ার ঘোষণা না দিলেও ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, জোট গঠনের প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে আমন্ত্রিত ৫১টি দেশের মধ্যে ৪৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
আঞ্চলিক উত্তেজনা
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জোট ঘোষণার আগে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেখানে তিনি ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত না করার পক্ষে সৌদি আরবের অবস্থান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, হুতি সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব নিজস্ব সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করতে চায়।
তবে পরবর্তীতে সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানে যৌথ বিমান হামলা চালায়। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান।
কেন গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর?
লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়।
বিশেষ করে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বাব আল-মান্দেব প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ।
হুতিদের ভূমিকা
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং একাধিক জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।
ইয়েমেন সরকারের অভিযোগ, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) এই পরিকল্পনায় হুতিদের সহায়তা করছে।
বিশ্ববাজারে প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা এবং লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকট একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হুতি হামলার আশঙ্কায় লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
