কেন দেশে ফেরানো সম্ভব হলো না বেনজীরকে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম
ফাইল ছবি
দেড় মাসেরও বেশি সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দুবাইয়ের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ইউরোপের একটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আইনি প্রক্রিয়া শেষে কারামুক্ত হন বেনজীর আহমেদ। এর আগে ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
তার মুক্তির পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পরও কেন তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলো না?
আইন ও আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এটি সদস্য দেশগুলোর কাছে একজন পলাতককে শনাক্ত বা সাময়িকভাবে আটক করার অনুরোধমাত্র। কাউকে প্রত্যর্পণ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও সরকারের ওপর নির্ভর করে।
আরো পড়ুন: বেনজীরের তথ্য কেন দেওয়া হচ্ছে না জানাল দুবাই পুলিশ
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার নথিপত্র, অভিযোগের আইনি ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় আদালতে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আদালত অভিযোগের ধরন, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ বিনিয়োগের মাধ্যমে তুরস্কের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট অর্জন করেছেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ কিংবা বেনজীর আহমেদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুবাইভিত্তিক সাংবাদিক ও দ্য অ্যারাবিয়ান পোস্ট-এর নির্বাহী সম্পাদক সাইফুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বেনজীর আহমেদ যদি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈধভাবে বসবাসকারী হন এবং সেখানে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ না থাকে, তাহলে তার আইনজীবীরা আদালতে সেই বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন।
তিনি উদাহরণ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তা মামুন ইমরান খান হত্যা মামলার আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তার বিরুদ্ধেও ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়েছিল। তবে ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহারের কারণে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়ে দুবাই পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি। রোববার (২ আগস্ট) কালবেলার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে দুবাই পুলিশ জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স ইমেইলে জানায়, তারা এ বিষয়ে কোনো তথ্য সরবরাহ করে না। তথ্য জানতে হলে বেনজীর আহমেদের কোনো আত্মীয়কে নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করতে হবে।
আরো পড়ুন: বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই: দুদক
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আদালতের শর্ত অনুযায়ী বেনজীর আহমেদের দুবাই ত্যাগের অনুমতি নেই এবং তার পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়ে তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথিপত্র ও আইনি বিষয়গুলো নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিনে মুক্তির আদেশ দেন।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে তিনি দেশ ছাড়েন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
