স্বপ্ন পূরণ না করেই লাশ হয়ে ফিরছেন ১৬ বাংলাদেশি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
সংসারের অভাব দূর করতে কেউ পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরবে, কেউ চেয়েছিলেন ঋণ শোধ করে বাড়ির কাজ শেষ করতে। কারও স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরে বিয়ে করে সংসার শুরু করা। আবার কেউ চেয়েছিলেন সন্তান ও পরিবারের জন্য একটু সচ্ছল জীবন নিশ্চিত করতে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়ে এখন তাদের দেশে ফিরতে হচ্ছে মরদেহ হয়ে।
গত রোববার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়, একজন নওগাঁ সদর উপজেলার, দুজন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার এবং একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫), সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং পার-নওগাঁ মহল্লার শাহিন (৩৮)।
এ ছাড়া নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা শ্রীপুরপাড়া গ্রামের সাব্বির হোসেন শুভ (২৯) ও দীঘিরপাড় গ্রামের শামীম হোসেন (৩০) এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ডাঙ্গাপাড়ার শ্যামল উদ্দিন মাঝি (৪৬) নিহত হয়েছেন।
‘বাড়ি এসে বিয়ে করব মা’
গন্ডগোহালি গ্রামের মোহন ও সুমনের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। দুই সন্তানকে হারিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছেন তাদের মা ময়না খাতুন। স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সন্তানদের কথা মনে করে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
ময়না খাতুন জানান, বড় ছেলে প্রায় সাত বছর এবং মেজো ছেলে দুই বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তারা ছুটিতে বাড়িও আসতে পারেননি। মায়ের কাছে তারা বলেছিলেন, কষ্ট করে কাজ করে ঋণ শোধ করছেন, বাড়ির কাজ শেষ করবেন এবং দেশে ফিরে বিয়ে করবেন।
সেই অপেক্ষা আর শেষ হলো না। যে ছেলের জন্য মা পাত্রী দেখার স্বপ্ন দেখছিলেন, এখন তাঁরই মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় পরিবার।
১৪ দিনের সন্তান বাবার অপেক্ষায়
রুবেল প্রামাণিকের পরিবারেও নেমে এসেছে গভীর শোক। প্রায় নয় বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে বিয়ে করেন এবং পরে আবার সৌদি আরবে ফিরে যান। ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
এরই মধ্যে রুবেলের ঘরে জন্ম নেয় আরেক সন্তান। সেই নবজাতকের বয়স এখন মাত্র ১৪ দিন। সন্তানকে রেখে বাবার এভাবে চলে যাওয়ার ঘটনায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, এত ছোট সন্তানকে রেখে ছেলের চলে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন। তিনি জানান, পরিবারের জন্য দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করেছেন রুবেল।
ঋণের বোঝা এখন পরিবারের কাঁধে
উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ প্রায় দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। বিদেশ যাওয়ার জন্য পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। তাঁর পাঠানো অর্থেই চলছিল সংসার এবং ধীরে ধীরে ঋণ শোধ হচ্ছিল।
ফরিদের বাবা ময়েন শেখ বলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে অনেক ঋণ করতে হয়েছে। এখন ছেলে না থাকায় সেই ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে এবং সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
ঘুমের মধ্যেই প্রাণহানি
ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভর স্বজনেরা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। তারা দিনে ঘুমিয়ে রাতে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেকেই ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন বলে পরিবারের কাছে খবর এসেছে।
বিএ পাস করার পর স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন হাসিবুল। চাকরি হারানোর পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় প্রায় তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান তিনি। পরিবারের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন হাসিবুল। সেই পরিবারের কাছেই এখন তাঁর মরদেহ ফেরার অপেক্ষা।
৪০ দিনের সন্তান নিয়ে শামীমের স্ত্রীর আহাজারি
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের শামীম হোসেনের বাড়িতেও শোকের পরিবেশ। মাত্র সাত মাস আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। দেশে রেখে গিয়েছিলেন স্ত্রী ও মাত্র ৪০ দিনের সন্তান।
শামীমের স্ত্রী মিতু বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, সন্তানটি এখনো বাবাকে ভালোভাবে চিনে উঠতে পারেনি। সংসারের সচ্ছলতার জন্য বিদেশে যাওয়া স্বামী এখন মরদেহ হয়ে ফিরবেন এ বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
শামীমের পরিবার জানিয়েছে, সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। এখনও ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধ করা হয়নি।
শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ছেলে সংসারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এখন তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের ভবিষ্যৎ ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
টিকিট কেটেও দেশে ফেরা হলো না শ্যামলের
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্যামল উদ্দিন মাঝি প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন। তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ ভালো করার আশায় বিদেশে গেলেও নানা কারণে দীর্ঘদিন পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি তিনি।
পরিবারের অনুরোধে আগামী শুক্রবার দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন শ্যামল। বিমানের টিকিটও কেটেছিলেন। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আর দেশে ফেরা হলো না তাঁর।
শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্বজনদের অপেক্ষা এখন মরদেহের জন্য
নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর নিহতদের বাড়িতে এখন একই চিত্র। স্বজনদের আহাজারি, শোক আর অপেক্ষা। কেউ প্রিয়জনের ছবি হাতে নিয়ে বসে আছেন, কেউ মরদেহ দেশে ফেরার খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন।
যে পরিবারগুলো একসময় স্বজনদের উপার্জনে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, এখন তাদের অপেক্ষা শুধু শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখার।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার দেওয়া এক শোকবার্তায় তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের শোক
সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
