২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, রক্তাক্ত সেই বিকেল
মাহিদুল হোসেন সানি
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ ঘিরে সেদিন জড়ো হয়েছিলেন বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক। মঞ্চে বক্তব্য চলছিল, চারপাশে ছিল মানুষের ভিড়। হঠাৎ একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে মুহূর্তেই পাল্টে যায় পুরো পরিস্থিতি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, আহতদের আর্তনাদ আর স্বজনদের কান্না।
সেদিনের ভয়াবহ হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান, সাবেক ঢাকা সিটি মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পার্সোনাল সিকিউরিটি গার্ড (পিএসজি) আবুল কালাম আজাদ, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম (অপু), ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আতিকুর রহমান, ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশতাক আহমেদ সেন্টু, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভানেত্রী ও ঢাকার কাউন্সিলর হাসিনা মমতাজ, ঢাকা মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী সুফিয়া বেগম, মহিলা আওয়ামী লীগ কর্মী রিজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী কুদরত আলী, যুবলীগ নেতা নাসির উদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী আব্দুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আওয়ামী লীগ নেতা মো. হানিফ, ছাত্রলীগ কর্মী মামুন মৃধা, আওয়ামী লীগ কর্মী রতন শিকদার, যুবলীগ কর্মী লিটন মুন্সী, আওয়ামী লীগ কর্মী আমেনাবানুম, জোবেদা বেগম। এছাড়াও জাহেদ আলী, মোমিন আলী, শামসুদ্দিন, ইসহাক মিয়া, আবুল কাশেম নামে ৫ পথচারী ও একজন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি নিহত হন।
আরো পড়ুন: ‘আমাকে তো নিয়ে যাবেনই’, দীপু মনির আকুতি
হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় চার শতাধিক মানুষ আহত হন। অনেকেই আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
হামলার পরপরই রক্তে রঞ্জিত আহতদের দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। হাসপাতালগুলোতে তখন সৃষ্টি হয়েছিল এক চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি—আহতদের জরুরি চিকিৎসা প্রদান, রক্তের জন্য স্বজনদের হাহাকার আর প্রিয়জনের খোঁজে আকুল মানুষের ভিড়ে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছিল।
আইভি রহমানের মৃত্যু বদলে দেয় শোকের মাত্রা
হামলার দিন গুরুতর আহতদের মধ্যে ছিলেন আইভি রহমান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ আগস্ট তার মৃত্যু হলে ২১ আগস্টের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪-এ।
আইভি রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী। তার মৃত্যু হামলার শোককে আরও গভীর করে তোলে।
২২ আগস্ট মামলা
হামলার পরদিন ২২ আগস্ট ২০০৪ সালে রাজধানীর মতিঝিল থানায় তৎকালীন মতিঝিল থানার এসআই ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব মামলার তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলার গতিপথ নিয়ে নানা বিতর্কও তৈরি হয়।
২০০৮ সালে প্রথম অভিযোগপত্রে ২২ জনকে আসামি করা হয়। পরে অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালে আরো ৩০ জনকে যুক্ত করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ জন। পরে অন্য মামলায় কয়েকজন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় ২১ আগস্ট মামলায় আসামির সংখ্যা ৪৯ জনে দাঁড়ায়।
দায়েরকৃত মামলায় আসামি করা হয়- বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মাওলানা তাজউদ্দিন, সাবেক এনএসআই মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ, হুজির সাবেক আমির মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, আব্দুল মাজেদ ভাট/ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শওকত ওসমান, মফিজুর রহমান ওরফে মহিবুল্লাহ, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ, ওরফে মুফতি মঈন, মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, আরিফুল ইসলাম আরিফ, মুফতি আবদুর রউফ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মুরসালিন, মুত্তাকিন, জাহাঙ্গীর বদর, আরিফ হাসান ওরফে সুমন/আবদুর, রাজ্জাক, আবু বকর সিদ্দিক ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো. ইকবাল, রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু, মাওলানা লিটন, মো. খলিল ওরফে খলিলুর রহমান, শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমীন, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, সাবেক আইজিপি শহিদুল হক, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, ডিএমপির সাবেক ডিসি (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, সাবেক এএসপি ও তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রশিদ সাবেক এএসপি/তদন্ত কর্মকর্তা, মুন্সী আতিকুর রহমান, সাবেক পুলিশ সুপার ও তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমীন।
আরো পড়ুন: রাজপথ থেকে রাষ্ট্রপতি, মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ইতিহাস
২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের রায়
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে এই রায়ই মামলার শেষ পরিণতি হয়নি। আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টে গড়ায়।
হাইকোর্টে সব আসামি খালাস
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে মামলার সব আসামিকে খালাস দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে এবং পরে আপিলের শুনানি শুরু হয়।
আপিল বিভাগেও বহাল খালাস
সবশেষে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বহাল রাখেন। ফলে ২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের সাজা আর কার্যকর নেই। ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও সেই খালাস বহাল রাখেন।
আরো পড়ুন: আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির শপথ নেবেন মির্জা ফখরুল
সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত আদেশেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাটি রাষ্ট্র বনাম মাওলানা শেখ আবদুস সালাম এবং অন্যান্য হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। আদালতের আদেশে আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির স্বেচ্ছাসম্মতি নিয়ে গুরুতর সন্দেহের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই দশক পরও অমলিন সেই স্মৃতি
২১ আগস্টের ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২৪টি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা এবং শত শত আহত মানুষের জীবনের পরিবর্তন। প্রতি বছর ২১ আগস্ট ফিরে এলে নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি হামলার তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং এর পেছনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও আলোচনা হয়।
দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ২০০৪ সালের সেই বিকেল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। নিহতদের স্বজনদের কাছে এটি হারানোর দিন, আর ইতিহাসের পাতায় ২১ আগস্ট এখনো বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়।
