×

মতামত

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনকাল, দুর্নীতি ও অপরাধ

Icon

এস আর সেলিম

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনকাল, দুর্নীতি ও অপরাধ

ছবি : সংগৃহীত

অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনাগুলো সাধারণত গোপনে ঘটে, এ কারণে সেগুলো অনেকটা আড়ালে থাকে। তবে অনুসন্ধানে কিছু দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসে। যদিও দুর্নীতির বিষয় সাধারণ মানুষকে তেমন প্রভাবিত করে না। অন্যদিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা অপরাধের ঘটনা কিন্তু গোপন থাকে না, তাৎক্ষণিক গণমাধ্যমে চলে আসে। আবার কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের আগেই সামাজিকমাধ্যমে অনেক অপরাধের খবর সঙ্গে সঙ্গে সামনে চলে আসে। পরে তা যাচাই করে গণমাধ্যমে আনা হয়। অর্থাৎ অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনাগুলো প্রকাশ পেতে বেশ সময় লাগে। পক্ষান্তরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হওয়ায় তা মানুষের ভেতরে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে আতঙ্কের পাশাপাশি শুরু হয় হইচই এবং তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেও দুর্নীতি নিয়ে তাদের মধ্যে খুব একটা মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যায় না। কারণ মানুষ আসলে 'নগদ' প্রভাবে বিশ্বাসী, মানুষ এখন চোখের দেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। 

তবে একটা সময় যখন গণযোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগের এত এত মাধ্যম কিংবা অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ ছিল না, গুজবও ছিল না। তখনকার সময় শুধুমাত্র সংবাদপত্রে 'শারমিন রীমা, এরশাদ শিকদার' টাইপ লোমহর্ষক ঘটনার ধারাবাহিক খবরে মানুষ বুঁদ হয়ে থাকতেন, কিন্তু এখনকার মতো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো যেত না। ফেসবুকে ভালো-মন্দ লিখে মানুষকে পক্ষে-বিপক্ষে বুঝদানের সুযোগটাই ছিল না। যাহোক এই লেখাটির সুযোগে সেই পুরোনো খবর আরেকবার ঝালিয়ে নেয়া যাক- নারায়ণগঞ্জে শিল্পপতি মুনীর হোসেনের সঙ্গে হোসনে আরা খুকু নামের এক নারীর পরকীয়া সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় ১৯৮৯ সালের ৯ এপ্রিল নববধূ শারমিন রীমাকে (সাংবাদিককন্যা) হত্যা করেন তার স্বামী মুনীর। ঠিক একদিন পর ১০ এপ্রিল মুনীর গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৩ সালের ২৭ জুলাই মুনীর হোসেনের ফাঁসি কার্যকর হয়। অন্যদিকে খুলনাঞ্চলের অপরাধ জগতের সম্রাট এরশাদ শিকদারকে ১৯৯৯ সালের ১১ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তার বিরুদ্ধে ৪৩টি মামলা ছিল। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ২০০৪ সালের ১০ মে খুলনা কারাগারে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। 

সাধারণ ধারণা মতে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ে; আর বিএনপি ক্ষমতায় আসলে অপরাধ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। সরলভাবে বিশ্লেষণ করলে, এ বিষয়ে দুই দলের শাসনামলের মূল পার্থক্যটা এখানেই দৃশ্যমান হয়। তবে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—উভয় সরকারের আমলেই সমানভাবে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। অবশ্য ক্ষমতাসীনদের বাইরে অন্য কারও পক্ষে বড় ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়ানো সহজ নয়, কারণ এর জন্য রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। পক্ষান্তরে অপরাধ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা সবসময় অপরিহার্য নয়। দলীয় ক্ষমতার বাইরেও অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি ক্ষমতাসীনদের বেকায়দায় ফেলতে বিরোধীপক্ষও অনেক সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। তবে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার চূড়ান্ত দায়ভার সবসময় ক্ষমতাসীন বা সরকারি দলের ওপরেই বর্তায়। 

আওয়ামী লীগ টানা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে রাষ্ট্রে তাদের প্রশাসনিক ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত ছিল। তাদের শেষ দেড় দশকে বিরোধী মত দমন এবং একদলীয় বা একচ্ছত্র আধিপত্য স্পষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালে ব্যাংক খাত, ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অর্থ পাচার হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ২৮টি উপায়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এই সময়ে সুশাসনের অভাব ও আর্থিক খাতের ব্যাপক অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। 

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির শাসনকালে (২০০১-২০০৬) আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে শীর্ষস্থান লাভ করেছিল। সে সময় প্রশাসনিক দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে বিএনপি সরকারের ভূমিকা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছিল। 

তবে বিএনপি পাঁচবার দুর্নীতিতে শীর্ষে থাকার সম্পূর্ণ দায় নিজেদের ওপর নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং এর পক্ষে তাদের নিজস্ব যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেয়। বিএনপি ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হয়। কিন্তু ওই বছরই প্রকাশিত টিআইয়ের প্রথম রিপোর্টে বাংলাদেশকে দুর্নীতির শীর্ষে দেখানো হয়। বিএনপির দাবি, মাত্র কয়েক সপ্তাহ ক্ষমতায় থেকে এই দুর্নীতির দায় তাদের ওপর বর্তায় না; বরং এই সূচকটি পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের (১৯৯৬-২০০১) সুশাসনের অভাবকে প্রতিফলিত করে। ২০০১ সালে বাংলাদেশের স্কোর যেখানে মাত্র ০.৪ ছিল (০-১০ স্কেলে), তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ফলে ২০০৬ সালে সেই স্কোর বৃদ্ধি পেয়ে ২.০-তে উন্নীত হয় এবং বাংলাদেশ শীর্ষস্থান থেকে নেমে তৃতীয় অবস্থানে চলে আসে। ফলে বিএনপি পুরো মেয়াদে দুর্নীতি বাড়িয়েছে এই অভিযোগ তারা নাকচ করে দেয়। বিএনপি তাদের শাসনামলে দুর্নীতি প্রতিরোধের সদিচ্ছার প্রমাণ হিসাবে ২০০৪ সালে তৎকালীন সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসাবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে সামনে আনে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৪ সালের ৯ মে আইনগতভাবে গঠিত হয় এবং একই বছরের ২১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। 

আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিরোধী দলের নেতাকর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা, বোমা হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা ও সহিংসতার ঘটনা এ সময়কার প্রধান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসাবে আলোচিত। 

অপরদিকে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, বিরোধী দল এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং বিরোধী মত দমনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের কিছু দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। বিদ্রোহীদের দমনে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের গণআন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। 

বিএনপি মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে থেকে আন্দোলন ও নির্বাচনমুখী রাজনীতি করেছে এবং তাদের শাসনামলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর ইতিহাস রয়েছে। যদিও পরবর্তীতে এই দলটির আমলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে লগি-বৈঠা আন্দোলন, দেশজুড়ে চরম রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পরে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এর আগে একই বছরের ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার পথ প্রশস্ত হয়। যা পরবর্তী সময়ে একদলীয় বা বিরোধিতাহীন নির্বাচনী সংস্কৃতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়। 

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের অংশ হিসাবে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' কর্মসূচির আগে গুলশানের বাসভবন ও কার্যালয়ের সামনে বালুর ট্রাক ও পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়। পরে ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ দিন বেগম জিয়াকে তাঁর গুলশান কার্যালয়ের সামনে একইভাবে ট্রাক ও পুলিশ মোতায়েন করে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল। 

পরবর্তীতে ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। দুই বছরেরও বেশি সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার শর্তসাপেক্ষে কারাগারের সাজা স্থগিত করে তাঁকে বাসায় চিকিৎসার অনুমতি দিলেও কার্যত তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাহী আদেশে খালেদার জিয়ার দণ্ড মওকুফ করে তাঁকে মুক্তি দেন। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পান। গত বছরের ৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান। দীর্ঘদিন পর তিনি ছেলে তারেক রহমান ও পরিবারের সদস্যদের কাছে পান। চিকিৎসা শেষে প্রায় চার মাস পর ৬ মে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর পুনরায় তিনি অসুস্থ হয়ে ২৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৩৭ দিন পর ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর লন্ডন থেকে সপরিবারে তারেক রহমান দেশে ফিরে আসেন। মজার ব্যাপার হলো, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় লড়াই করার জন্য যে শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছেন তাঁর মৃত্যুতে দেওয়া শোক বার্তায় সেই শেখ হাসিনাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ও অবদানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে স্বীকার করেন। 

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয়প্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে সম্প্রতি অপারেশন ক্লিন হার্ট অথবা যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়। তবে সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসআরবি, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে কী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে? 

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট। পরে ১০ অক্টোবর জোটপ্রধান ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তখনকার জোটসঙ্গী বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতা এই সরকারের ক্যাবিনেটে স্থান পেয়েছিলেন। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী শিল্পমন্ত্রী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় অপরাধ দমনে ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর অপারেশন ক্লিন হার্ট শুরু হয়েছিল। ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এ অভিযান চলেছিল। এই সময়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং অপরাপর অপরাধীদের পাশাপাশি বিএনপির অনেক নেতাকর্মী অপারেশন ক্লিন হার্টে আটক হয়েছিলেন। অর্থাৎ কোনো দলীয় পরিচয় দেখে সারাদেশে এ অভিযান চালানো হয়নি। 

অপারেশন ক্লিন হার্ট স্থগিত হওয়ায় পরবর্তীতে সন্ত্রাস দমন, জঙ্গি দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) গঠন করা হয়। ওই বছরের ১৪ এপ্রিল থেকে র‍্যাব তাদের কার্যক্রম শুরু করে। সম্প্রতি র‍্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নাম দেওয়া হয় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ঘটে যাওয়া র‍্যাবের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও পুনর্গঠনের দাবির প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে আইন পাস এবং ১৫ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে র‍্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে এই বিশেষায়িত বাহিনীটি গঠন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বাহিনীর কাজের মান ও ভাবমূর্তি উন্নত করার লক্ষ্যে সরকার এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এর আগে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হলেও এসআরবির পোশাক আগের মতোই কালো রাখা হয়েছে। 

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে র‍্যাব বহাল রাখলেও তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার করে। এই ট্রাইব্যুনালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আগের সরকারের দুই মন্ত্রী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং জামায়াতে ইসলামীর আরও তিন নেতাসহ মোট ৬ জনকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় এসব ফাঁসি কার্যকর করা হয়। 

সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর গত বছরের ১৭ নভেম্বর নিজের গড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই ও আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এদিকে ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় দলীয় নেতাকর্মীরা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মিছিল বের করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। 

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা সাধারণ নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে দেশ ছেড়ে বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করলেও দেশে অবস্থানরত দলটির এই নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা এখনও সক্রিয় রয়েছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে এবং নিজেদের পক্ষের ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন পোস্টে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে ভীতিকর অবস্থায় থাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উজ্জীবিত বা চাঙ্গা করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে কথিত নাশকতা মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের আবিষ্কার করা সেই 'নাশকতা' মামলায় এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ডিসেম্বরে দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা সত্যিই যদি দেশে ফেরেন তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। 


লেখক: এস আর সেলিম, সাংবাদিক, ৭ অক্টোবর ২০২৬।


সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

এনআইডিসহ নাগরিকের গোপনীয় তথ্য বিক্রির অভিযোগ, ৪ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

এনআইডিসহ নাগরিকের গোপনীয় তথ্য বিক্রির অভিযোগ, ৪ পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার

ছয় দিনে রেমিট্যান্স এলো ৭ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা

ছয় দিনে রেমিট্যান্স এলো ৭ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা

ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার কল্যাণে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার কল্যাণে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি সই

এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি সই

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App