×

জাতীয়

গ্যাস সংকটে দেশজুড়ে লোডশেডিং, দুর্ভোগে জনজীবন

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ এএম

গ্যাস সংকটে দেশজুড়ে লোডশেডিং, দুর্ভোগে জনজীবন

ছবি : সংগৃহীত

দেশে গ্যাস সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় গত কয়েক দিনে লোডশেডিং বেড়েছে। এতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে আবাসিক গ্রাহক—প্রায় সব শ্রেণির ভোক্তাই ভোগান্তিতে পড়েছেন।

এলএনজি টার্মিনালে একের পর এক কারিগরি সমস্যা, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো খালাসে বিঘ্ন এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি টার্মিনাল সাময়িকভাবে চালু হলে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট। অথচ সংকটের সময় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৯৩০ থেকে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে কোনো কোনো দিনে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে আসে ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। শুক্রবার মোট সরবরাহ ছিল ২ হাজার ২০১ মিলিয়ন ঘনফুট। শনিবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০৭ মিলিয়ন ঘনফুটে। তবে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি তখনো এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ছিল।

একের পর এক সমস্যায় এলএনজি টার্মিনাল

দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন।

জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার পর সরবরাহ কমে যায়। পরে সেটি আংশিক সচল হলেও অন্য টার্মিনালেও সমস্যা দেখা দেয়। ১৩ আগস্ট বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি বহনকারী জাহাজ টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় সামিটের টার্মিনালের সরবরাহও ব্যাপকভাবে কমে যায়। একপর্যায়ে দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে।

পরে সামিটের টার্মিনাল পুনরায় সরবরাহ শুরু করলেও এক্সিলারেটের টার্মিনালে নতুন করে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে একটি টার্মিনাল সচল হওয়ার পর অন্যটির সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনা সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।

তিন দিন পর এক্সিলারেট টার্মিনাল চালু

এলএনজি কার্গোর ঘাটতির কারণে তিন দিন বন্ধ থাকার পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল শনিবার দুপুরে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে সেখান থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একই সময়ে দুটি এফএসআরইউ থেকে মোট এলএনজি সরবরাহ ছিল ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই এলএনজি সরবরাহকারী জাহাজ পৌঁছে যাওয়ায় টার্মিনালটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়। এর আগে মজুত এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৯ আগস্ট থেকে টার্মিনালটির সরবরাহ বন্ধ ছিল।

সাময়িক স্বস্তি, কাটেনি সংকট

এক্সিলারেট টার্মিনাল চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটেনি। শনিবার দেশে গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৪০৭ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বর্তমান সংকট শুধু টার্মিনালের সাময়িক সমস্যার কারণে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্যহীনতাও এর বড় কারণ।

কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন

দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমছে। বিপরীতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর গতি তুলনামূলক কম। ফলে ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

স্বাভাবিক সময়েও দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশীয় উৎপাদনসহ মোট সরবরাহ থাকে প্রায় ২ দশমিক ৬ থেকে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। এলএনজি থেকে আসে এক বিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।

একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই সংকট কেন বাড়ে

বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি অবকাঠামোর বড় অংশ দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ বা আংশিকভাবে অচল হলে জাতীয় গ্রিডে একসঙ্গে কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, এতে দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিকল্প সরবরাহ ও বাফার সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ালে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

সবচেয়ে বেশি চাপে বিদ্যুৎ খাত

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট হলেও সংকটের সময় সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে গ্যাস সংকট সরাসরি বিদ্যুৎ সংকটে রূপ নেয়। কোনো কোনো এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে।

শিল্প উৎপাদনেও বড় ধাক্কা

টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, স্টিল, সিরামিক, কাচ, সারসহ বিভিন্ন শিল্প গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হলে কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সিএনজি স্টেশনেও ভোগান্তি

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ির সারি তৈরি হচ্ছে। চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্যাসের জন্য।

একজন চালকের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনে দুইবার গ্যাস নিতে গিয়ে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে। এতে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি আয়ও কমছে। অনেক চালক প্রতিদিনের গাড়ির জমার টাকাও ঠিকমতো তুলতে পারছেন না।

আবাসিক গ্রাহকরাও ভুক্তভোগী

শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করায় অনেক আবাসিক এলাকায় চাপ কমে গেছে। কোথাও চুলা জ্বলছে না, কোথাও রান্না করতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, ফলে বাড়ছে পারিবারিক ব্যয়।

স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর গতি কম, এলএনজি আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে এবং জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত করার বিকল্প অবকাঠামো সীমিত।

স্থায়ী সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধিতে ওয়ার্কওভার ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং অতিরিক্ত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিয়ে থামিয়ে অসুস্থ ক্যাটারিং কর্মীর পাশে কনে, অতঃপর...

বিয়ে থামিয়ে অসুস্থ ক্যাটারিং কর্মীর পাশে কনে, অতঃপর...

ভারতের উপকূলে বাংলাদেশীসহ ২৪ নাবিক নিয়ে জাহাজডুবি

ভারতের উপকূলে বাংলাদেশীসহ ২৪ নাবিক নিয়ে জাহাজডুবি

মন্ত্রিসভায় রদবদল, কোন বার্তা দিল সরকার

মন্ত্রিসভায় রদবদল, কোন বার্তা দিল সরকার

গ্যাস সংকটে দেশজুড়ে লোডশেডিং, দুর্ভোগে জনজীবন

গ্যাস সংকটে দেশজুড়ে লোডশেডিং, দুর্ভোগে জনজীবন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App