‘পদ্মার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বাংলাদেশের চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে’
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের সঙ্গে পদ্মার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনায় যাওয়ার আগে বাংলাদেশের নিজেদের পানির চাহিদা ও প্রয়োজনীয় ন্যূনতম প্রবাহ নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ভারতের চাহিদা ও স্বার্থও বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে হবে। শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে দুই দেশের স্বার্থের সমন্বয়ে সমাধান খুঁজতে হবে।
রোববার নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) আন্তসীমান্ত পানিবণ্টন ও পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি) আয়োজিত ‘ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার শেয়ারিং ইস্যুজ অ্যান্ড পদ্মা ব্যারেজ’ শীর্ষক সেমিনারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হলে অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ইউনিভার্সিটির সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পানি কূটনীতি বিষয়ের অধ্যাপক শফিক ইসলাম। তিনি বলেন, পদ্মার (ভারতে গঙ্গা) পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশকে নিজেদের প্রয়োজনের পাশাপাশি ভারতের চাহিদাও স্পষ্টভাবে বুঝে আলোচনায় বসতে হবে।
ধারণাপত্রে বলা হয়, এ আলোচনায় শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ। অন্যদিকে ভারতের বিহারে বন্যা ও পলি নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ কলকাতা বন্দরের নাব্যতা।
এ কারণে আলোচনায় যাওয়ার আগে বাংলাদেশের প্রকৃত পানির চাহিদা কত এবং কোন ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা জরুরি বলে মত দেন শফিক ইসলাম।
আরও পড়ুন: নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ২৫ উন্নয়ন প্রকল্প স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
পদ্মার পানি নিয়ে প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন সমাধান খোঁজার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারে—এমন একটি উদ্ভাবনী সমাধান বের করতে হবে। সেই সমাধানকে একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও তা বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।
অন্য একটি ধারণাপত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সংরক্ষণ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সেচ, কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সুফল পাওয়া যেতে পারে।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর পদ্মার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সমাধানে পৌঁছানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, উজান ও ভাটির স্বার্থ পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়। উজানে পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভাটির দেশের স্বার্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভাটির নদী ও পানিব্যবস্থাপনার বিষয়টিও উজানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় উভয় দেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে।
এ লক্ষ্যে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, গঙ্গা-পদ্মা পানি ব্যবস্থাপনায় নির্ভরযোগ্য প্রবাহ নিশ্চিত করা, পানি সংরক্ষণ এবং উজান-ভাটির মানুষের স্বার্থের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলে টেকসই সমাধানে পৌঁছানো যাবে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজের নকশা এমনভাবে করা হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করা যায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীর প্রবাহ সচল রাখা, লবণাক্ততা কমানো, কৃষি ও মানুষের জীবিকা রক্ষা এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
এর পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সমন্বিত উন্নয়নের বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হবে। তিনি বলেন, পানি শুধু প্রকৌশলগত কোনো বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন এবং সেশন পরিচালনা করেন এনএসইউর সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এসআইপিজির সিনিয়র গবেষণা ফেলো ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান এবং এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম হকসহ অন্যরা।
