বেরোবির মেসে ডাল-ভর্তায় মাস পার
ব্রয়লারের এক টুকরোতেই আমিষের চাহিদা
আজিজুর রহমান, বেরোবি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
উত্তরের বাতিঘর খ্যাত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন হাজারো তরুণ-তরুণী। তবে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পাশাপাশি মেসজীবনের কঠিন বাস্তবতায় সেই স্বপ্নের সঙ্গে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন সংকট। বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে মেসের খাবারের তালিকা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ডাল-আলুভর্তা দিয়ে মাস পার করছেন অনেক শিক্ষার্থী। আর আমিষের চাহিদা মেটাতে ভরসা করতে হচ্ছে ব্রয়লার মুরগির ছোট এক টুকরো মাংস কিংবা অর্ধেক ডিমের ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই ক্যাম্পাসের আশপাশের বিভিন্ন মেস ও বাসাবাড়িতে থাকেন। এসব মেসের অনেক শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন খাবারে আমিষ বা প্রোটিনের উপস্থিতি থাকছে দিনে সর্বোচ্চ একবার, সেটিও অতি সামান্য পরিমাণে। সবুজ শাকসবজি নিয়মিত খাবারের তালিকায় থাকাটাও অনেকের কাছে যেন বিলাসিতা।
আরও পড়ুন: শিশু আছিয়া হত্যা, হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল
ফলে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই সামান্য ডাল ও আলুভর্তা দিয়ে খাবার সারতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। দুপুর বা রাতে কখনো একটি ডিম ভেজে বা সেদ্ধ করে দুজনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।
বাজারদরের চাপে খাবারের তালিকা ছোট
নিত্যপণ্যের চড়া দামের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মেসের খাবারে। সবজির নামে প্রতিদিনের মেন্যুতে অনেক সময় থাকছে আলুর আধিক্য। কখনো আলু-ডাল, কখনো আলুভর্তা- এভাবেই চলছে খাবারের আয়োজন। মসুর ডালের অবস্থাও করুণ। পরিমাণ বাড়াতে ডালে এত বেশি পানি মেশানো হয় যে, সেটি অনেক সময় ডালের চেয়ে পাতলা ঝোলের মতো হয়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তরুণ বয়সে পড়াশোনা ও মেধা বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আরও পড়ুন: পে স্কেল নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত আজ
বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর মেসের খাবার ও সংশ্লিষ্ট খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। কারও ক্ষেত্রে এই ব্যয় আরও বেশি। পড়াশোনার অন্যান্য খরচের পাশাপাশি এই অর্থ জোগাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। একদিকে অর্থের সংকট, অন্যদিকে পুষ্টিহীন খাবার- দুইয়ের চাপে মেসজীবন কঠিন হয়ে উঠেছে তাদের।
‘এক প্লেট ভাতেই বেঁচে আছি’
জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম শাহজালাল রিয়াদ তিন বছর ধরে ‘আল্লাহর দান’ মেসে থাকেন। মেসের খাবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভোর ৫টায় দিন শুরু হয়। এরপর পড়াশোনা শেষে সকাল ৯টার দিকে খাবারের টেবিলে থাকে পাতলা ডাল ও আলুভর্তা। সেটুকু খেয়েই দুপুর পর্যন্ত ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্টের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
তার ভাষ্য, দুপুরের খাবারে বড় এক বাটি ভাতের সঙ্গে থাকে ব্রয়লার মুরগির এক টুকরো মাংস। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মাংসের আকারও ছোট হচ্ছে। সঙ্গে থাকে বাজারের তুলনামূলক কমদামি কোনো সবজি, যাতে আলুর পরিমাণই বেশি।
আরও পড়ুন: ৬ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আভাস
তিনি বলেন, দুপুরের খাবার খেয়ে টিউশনে যেতে হয়। সন্ধ্যা বা রাতে ফিরে আবার সেই ভাত, ডাল ও সবজি। কখনো বাজারের সস্তা মাছ থাকলে সেটিও জোটে। পুষ্টিমান বিবেচনা করার সুযোগ নেই, মূলত এক প্লেট ভাতের ওপর নির্ভর করেই দিন কাটাতে হচ্ছে।
শাহজালাল বলেন, “মস্তিষ্কজুড়ে বিশাল স্বপ্ন, অথচ পেটে রাজ্যের ক্ষুধা। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই খাবার খেয়ে কি যুদ্ধ করা যায়?”
এক মাসে ওজন কমেছে ৬ কেজি
তানভীর হাসান দিপু বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর। কিছুদিন আগেও তুলনামূলক কম খরচে মাছ-মাংস ও বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে দুবেলা খাবার খাওয়া সম্ভব ছিল। এখন বাজারদরের কারণে খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, সকালে ডাল, ভর্তা ও ভাত এবং দুপুর-রাতে প্রায় একই ধরনের খাবারই অনেকের নিত্যদিনের রুটিন। আগে দুবেলা আমিষ ও বিভিন্ন সবজি খাওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন একটি সবজি দিয়েই খাবার শেষ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো দিন একবেলা তুলনামূলক সস্তা ব্রয়লার মাংস খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সন্তান বিক্রি করে আইফোন কিনলো বাবা, অতঃপর...
তানভীরের দাবি, এর প্রভাব তার শরীরেও পড়েছে। গত মাসে তার ওজন ছিল ৭৮ কেজি। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় এক মাসে ওজন কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ কেজিতে।
তিনি বলেন, “আমরা বিলাসী খাবার চাই না; চাই সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার। একজন শিক্ষার্থীকে যদি প্রতিদিনের খাবারের হিসাব করতে গিয়ে পুষ্টির সঙ্গে আপস করতে হয়, সেটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, শিক্ষার্থী সমাজের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।”
‘ডাল এত পাতলা, মনে হয় পানি-হলুদ’
রংপুরের চকবাজারের একটি মেসে থাকেন বেরোবির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রামিশা ফারিয়া। তিনি জানান, তাদের মেসে প্রায় ২৩০ জন বোর্ডার রয়েছেন। প্রতিদিন মিল চার্জ ৩০ টাকা। এর পাশাপাশি মাসে প্রায় ১৫ কেজি চাল দিতে হয়।
ফারিয়া বলেন, সকালে সাধারণত ডাল ও আলুভর্তা থাকে। মাঝে মাঝে শাক, বেগুন বা আলুভাজিও দেওয়া হয়। তবে ডাল এতটাই পাতলা যে, দেখে মনে হয় পানি ও হলুদ মিশিয়ে রাখা হয়েছে। দুপুরে আমিষ বলতে ব্রয়লার মুরগির ছোট এক টুকরো মাংস ও সবজি থাকে। কখনো ডিম দেওয়া হলেও তা অর্ধেক করে দেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, মেসে মাছ খুব কম দেওয়া হয়। দিলেও তা সবসময় ভালো মানের হয় না। আর সবজিতে আলুর পরিমাণ এত বেশি থাকে যে কোন সবজি রান্না হয়েছে, সেটি বোঝাই কঠিন।
ফারিয়া বলেন, “এই খাবারে আমাদের আমিষের চাহিদা পূরণ হয় না। পর্যাপ্ত আমিষ ও পুষ্টি না পাওয়ায় ধীরে ধীরে নানা শারীরিক সমস্যাও অনুভব করছি।”
খাবার খেতে না পেরে নিজেই রান্না
মাহফুজা মিমু বলেন, মেসে ওঠার পর প্রথম অভিজ্ঞতা তার জন্য ভালো ছিল না। প্রথম দিকে মেসের মিল খেতেন। কিন্তু অনেক সময় খাবার মুখে দেওয়ার মতো থাকত না, ফলে ফেলে দিতে হতো।
আরও পড়ুন: মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে ঘুষ, প্রতিবাদে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি
তিনি বলেন, রান্নার মান ভালো না হওয়ার পাশাপাশি খাবারে সবজি ও আমিষের পরিমাণও কম। আবার ক্লাস শেষে ফিরে অনেক সময় খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অল্প টাকায় ভালো মানের বাজার করাও কঠিন।
মেসের বাজার ও খাবার নিয়ে নানা অভিযোগ থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই রান্না করে খাওয়া শুরু করেছেন বলে জানান।
ব্রয়লারই যখন একমাত্র ভরসা
দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাসফিকুল হাসান রংপুরের পার্কের মোড়ের একটি মেসে থাকেন। তিনি বলেন, রংপুরে সবজির দাম প্রায়ই ওঠানামা করে। মাছ ও ডিমের দামও তুলনামূলক বেশি। ফলে সাধ্যের মধ্যে থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই ব্রয়লার মুরগি কিনতে হয়।
তিনি বলেন, নিয়মিত ব্রয়লার মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয় জেনেও বাজারের খরচ সামলাতে এটিই বেছে নিতে হচ্ছে। আবার এক পিস মাংসের পরিমাণ এত কম যে, তা দিয়ে আমিষের চাহিদা পূরণ করাও কঠিন। সকালের খাবারে ডাল ও আলুভর্তা যেন প্রতিদিনের সঙ্গী।
আরও পড়ুন: জর্ডানে দুই মার্কিন সেনা ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিলো ইরান
মাসফিকুল বলেন, “মেস লাইফ কেবল থাকার জায়গা নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেওয়ার কেন্দ্র। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অধিকাংশ মেসে পরিবেশন করা খাবারের মান খুবই নিম্ন। শরীর সুস্থ না থাকলে মানসিক মনোযোগ ধরে রাখা অসম্ভব।”
তার মতে, নিম্নমানের খাবারের কারণে শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতা নিয়মিত পড়াশোনা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। একজন শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ মেধা বিকাশের জন্য সুষম ও মানসম্মত খাবার অপরিহার্য।
চিকিৎসকের পরামর্শ, দরকার সুষম খাদ্য
বেরোবি মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. এ.এম.এম. শাহরিয়ার বলেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ফাইবার ও পানির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। কার্বোহাইড্রেট মোট খাদ্যের ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং প্রোটিন ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। মাংসপেশির শক্তি ও গঠনের জন্য প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ, আর বাড়ন্ত বয়সে এর প্রয়োজন আরও বেশি।
তিনি বলেন, প্রোটিনের ঘাটতি হলে শিক্ষার্থীরা অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগতে পারেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কম ওজনসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক শিক্ষার্থী মেসের খাবার পছন্দ না হওয়ায় বা খাবারের মান খারাপ হওয়ায় খালি পেটে থাকেন। এতে গ্যাস্ট্রিক ও আলসারের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন: এবার রাবি শিক্ষিকার ব্যাগ ছিনতাই, সঙ্গে ছিল আইফোন-কার্ড
তবে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ ও খরচ কমানোর জন্য অতিরিক্ত ব্রয়লার মুরগি খাওয়াও ঠিক নয় বলে সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, খাবারের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রাখা জরুরি।
ডা. শাহরিয়ার বলেন, সুষম ও নিরাপদ খাদ্য সবার অধিকার। বিশেষ করে যারা পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে, তাদের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মাছ-মাংসের পাশাপাশি ডিমও প্রোটিনের ভালো উৎস। প্রতিদিন অন্তত একটি ডিম, মসুর ডাল বা বীজজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারে সবুজ শাকসবজি রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বপ্নের পথে পুষ্টির সংকট
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, মেসজীবনে তাদের চাওয়া কোনো বিলাসী খাবার নয়। চাওয়া শুধু সাধ্যের মধ্যে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার। কিন্তু বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি, সীমিত আয় ও মেসের ব্যবস্থাপনার কারণে সেই চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না।
পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াইয়ে থাকা এসব শিক্ষার্থীর কাছে এখন এক প্লেট ভাতই প্রধান অবলম্বন। সেই ভাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত আমিষ, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব তাদের স্বাস্থ্য, পড়াশোনা ও মেধা বিকাশে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কাই করছেন শিক্ষার্থীরা।
