পে স্কেলে কমছে ইনক্রিমেন্ট
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬-এ সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান কাঠামোর মতো সব গ্রেডে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট না দিয়ে গ্রেডভেদে ভিন্ন হার নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে উচ্চপদে বেতন যত বেশি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তত কমবে।
তবে নতুন কাঠামোয় মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ফলে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমানো হলেও মূল বেতন বাড়ার কারণে টাকার অঙ্কে এ ভাতার পরিমাণ বাড়বে। পাশাপাশি চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, ধোলাইসহ বেশ কয়েকটি ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
গ্রেডভেদে ইনক্রিমেন্টের হার
বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন বেতন কাঠামোয় ২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ হার বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর ওপরের গ্রেডগুলোতে ধাপে ধাপে ইনক্রিমেন্টের হার কমবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পঞ্চম গ্রেডে ইনক্রিমেন্ট হবে ৪ শতাংশ। চতুর্থ ও তৃতীয় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কথা রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই নীতি অনুসরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা, যা প্রথমে ৫ শতাংশ এবং পরে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৯৭৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সরকার আটটি পে স্কেল বাস্তবায়ন করেছে। সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর পরপর নতুন পে স্কেল দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোয় সব গ্রেডের জন্য ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু করা হয়। তখন মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের বেশি হলে তার সঙ্গে সমন্বয় করে ইনক্রিমেন্ট বাড়ানোর কথা বলা হলেও সেই সিদ্ধান্ত আর কার্যকর হয়নি।
বাড়িভাতা কমছে, তবে টাকার অঙ্ক বাড়বে
২০১৫ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পান। নতুন পে স্কেলে এ হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতনের হার কমলেও বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব থাকায় প্রকৃত বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণ বাড়বে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলায় বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলার বাইরে কর্মরতদের বাড়িভাড়া ভাতা বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় তা ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আট বছরেই প্রথম উচ্চতর গ্রেড
বর্তমান কাঠামোয় একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি পূর্ণ হলে একজন চাকরিজীবী স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডে বেতন পান। নতুন বেতন কাঠামোয় এই সময় কমিয়ে আট বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে পদোন্নতি ছাড়া দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে ছয় বছর চাকরির শর্ত বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ পদোন্নতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না হলে অবসরের আগে সর্বোচ্চ দুই ধাপ উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
অন্যদিকে, যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ব্লকড পদ হিসেবে ঘোষিত, সেসব পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাবেন। প্রথমবার আট বছর, দ্বিতীয়বার আরও ছয় বছর এবং তৃতীয়বার পরবর্তী আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও বড় পরিবর্তন
জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬-এর গ্রেড ও বেতন ধাপ অনুসরণ করে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন কোরের মোট ১৭টি ও সমতুল্য পদবির বেতন স্কেল গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-১৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নন-কমব্যাট্যান্ট বা এনসি (ই) ও সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মেজর জেনারেল ও সমতুল্য পদে জাতীয় বেতন স্কেলের প্রথম গ্রেডের সমান ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমমানের পদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমমর্যাদার পদকে গ্রেড-৩-এর প্রারম্ভিক ধাপে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিমান বাহিনীর উড্ডয়ন ভাতা বর্তমান হারের তুলনায় ১০০ থেকে ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, যোগ্যতা, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ ভাতা ১০ শতাংশ করে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো বা স্নাইপার, সোয়াডস বা স্কুবা ডাইভিং এবং সদাচরণ ভাতাও বর্তমান পরিমাণের তুলনায় ১৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ৮১ ধরনের ভাতা পর্যালোচনা করেছে সচিব কমিটি। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশিরভাগ ভাতা ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। জরিপ ভাতা ৩০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
পূর্ণ বাস্তবায়নে ব্যয় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা
অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রণয়নের কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুলাই, আগামী ডিসেম্বর এবং পরবর্তী জুলাই—এই তিন ধাপে নতুন কাঠামোর মূল বেতন কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। আর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে সব ধরনের ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে তিন বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বছর অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা, ২০২৭ সালে ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা এবং ২০২৮ সালে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বেতন, ভাতা, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্ট বাবদ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। নতুন স্কেল বাস্তবায়ন হলে চলতি অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।
পরবর্তী অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় বেড়ে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা হতে পারে। আর ২০২৮ সালে সব ভাতা কার্যকর হলে বেতন, ভাতা, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্ট মিলিয়ে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা।
