গ্যাসের নতুন মজুতের খোঁজে বাপেক্স
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
হবিগঞ্জের মাটির নিচে নতুন গ্যাসের মজুত রয়েছে কি না, তা জানতে অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় চলছে ত্রিমাত্রিক (৩-ডি) সাইসমিক জরিপ। এর মাধ্যমে ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরের তথ্য সংগ্রহ করে সম্ভাবনাময় গ্যাসের কাঠামো চিহ্নিত করা হবে।
সোমবার সকালে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদের ফসলি জমিতে বাপেক্সের কর্মীদের ৩-ডি সাইসমিক জরিপ চালাতে দেখা যায়। গত এক সপ্তাহ ধরে মাধবপুরের বিভিন্ন এলাকায় এ অনুসন্ধানের প্রস্তুতি চলছে। এরই অংশ হিসেবে কয়েকটি স্থানে এক্সপ্লোসিভ স্থাপনের কাজও করা হচ্ছে।
বাপেক্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাসিম উদ্দিন জানান, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাটির নিচের বিভিন্ন স্তর থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য এ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বাপেক্সের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. মোত্তালেব হোসেন পলাশ জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অনুসন্ধান কার্যক্রম চলবে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।
তিনি বলেন, ৩-ডি সাইসমিক জরিপ গ্যাস অনুসন্ধানের প্রাথমিক ধাপ। প্রথমে ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পরে বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তা চিহ্নিত করবেন। সম্ভাবনাময় স্থান পাওয়া গেলে সেখানে অনুসন্ধান কূপ খনন করে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।
‘হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা ফিল্ডে ৩-ডি সাইসমিক জরিপ’ প্রকল্পের আওতায় মাধবপুর, চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, হবিগঞ্জ সদর ও আশপাশের এলাকায় জরিপটি পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, নতুন গ্যাস রিসোর্স ও রিজার্ভ আবিষ্কারের লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ২২ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক স্মারকে হবিগঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাপেক্সের মাধ্যমে ৩-ডি সাইসমিক জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক আদেশ অনুমোদন করা হয়। একই বছরের ২০ মার্চ জরিপ পরিচালনার জন্য বাপেক্স ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) মধ্যে চুক্তি হয়।
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের জরিপে সার্ভে ও খননযন্ত্র, ক্যাবল, জিওফোন ও রেকর্ডিং যন্ত্রের পাশাপাশি অনুমোদিত ব্যবস্থায় এক্সপ্লোসিভ ও ডেটোনেটর ব্যবহার করা হয়।
বাপেক্স কর্মকর্তারা জানান, ৩-ডি সাইসমিক জরিপের মাধ্যমে ভূগর্ভের একটি বৈজ্ঞানিক চিত্র তৈরি করা হয়। মাটির নিচে কম্পন সৃষ্টি করে সেই তরঙ্গ বিভিন্ন স্তরে কীভাবে প্রতিফলিত হয়, তার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ভূগর্ভের স্তরগুলোর গঠন এবং গ্যাস থাকার সম্ভাব্য স্থান শনাক্ত করেন।
তবে সাইসমিক জরিপে কোনো এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেলেই সেখানে গ্যাসের মজুত রয়েছে—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। গ্যাসের প্রকৃত উপস্থিতি, মজুতের পরিমাণ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা জানতে পরবর্তী ধাপে অনুসন্ধান কূপ খনন করতে হবে।
দাসপাড়া গ্রামের ফসলি জমিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষিজমির মধ্যেই বাপেক্সের কর্মীরা অনুসন্ধানের কাজ করছেন। নতুন এ কার্যক্রম ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘মাটির নিচে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে দাসপাড়াসহ আশপাশের এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’
মাধবপুরে এ অনুসন্ধানের গুরুত্বও রয়েছে। উপজেলার শাহজিবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই গ্যাসভিত্তিক স্থাপনা ও শিল্পকারখানা রয়েছে। নতুন কোনো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে পুরো হবিগঞ্জের অর্থনীতিতে।
বাপেক্স জানিয়েছে, অনুসন্ধান কার্যক্রমের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। জরিপ নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা প্রয়োজন।
দেশে বাড়তে থাকা জ্বালানি চাহিদার মধ্যে নতুন দেশীয় গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে তা হবিগঞ্জের পাশাপাশি পুরো দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নিজস্ব উৎস থেকে নতুন গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি চাহিদা পূরণে তা সহায়ক হবে।
তবে চলমান জরিপের ভিত্তিতে এখনই হবিগঞ্জে নতুন গ্যাস আবিষ্কারের দাবি করার সুযোগ নেই। ৩-ডি সাইসমিক জরিপ মূলত সম্ভাবনাময় ভূগর্ভস্থ কাঠামো শনাক্তের প্রাথমিক ধাপ। জরিপের ফল বিশ্লেষণের পর অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে। এরপরই নিশ্চিত হওয়া যাবে, মাধবপুরের দাসপাড়ার মাটির নিচে সত্যিই নতুন গ্যাসের মজুত রয়েছে কি না।
