আজই হতে পারে পে-স্কেলের গেজেট, কোন গ্রেডে বেতন কত?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০২ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ গ্রাফিক্স
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। আলোচিত ও কাঙ্ক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির কাজ এখন একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) এই প্রজ্ঞাপন ছাপানোর কাজ পুরোদমে চলছে।
এদিকে, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরের পর প্রজ্ঞাপন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কথা থাকলেও প্রায় তিন সপ্তাহেও তা প্রকাশ হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রজ্ঞাপন জারির জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরের পর প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপন ছাপার কাজ করছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এখন প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। আজই প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তারা জানান।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর করা হবে না। এটি তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ধরা হবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। অর্থাৎ ওই তারিখ থেকেই নতুন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি হিসাব করা হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারি হিসাবে এই ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এক দশকেরও বেশি সময় পর নতুন বেতন কাঠামো পেতে যাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। প্রস্তাবিত কাঠামোয় গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বাড়ছে। ফলে এসব গ্রেডে আগের তুলনায় মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হবে।
মূল গেজেটের পাশাপাশি থাকছে একাধিক এসআরও
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে একটি মূল গেজেটের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক ৫ থেকে ৭টি এসআরও জারির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত এসআরওগুলোর আওতায় বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সশস্ত্র বাহিনী, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য আলাদা বাস্তবায়ন আদেশ থাকার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি সরকারি বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার ‘আইবাস++’-এও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ২০১৫ সালের পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় এই সফটওয়্যার চালু ছিল না। এবার ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ায় বেতন পুনর্নির্ধারণ বা ফিক্সেশন এবং নতুন হিসাব কাঠামো যুক্ত করার কাজ চলছে।
এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে অবসরে যাওয়া প্রায় সাড়ে ৯ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য এবং তাদের পেনশনের স্তর সমন্বয়ের কাজও করা হচ্ছে।
২০ গ্রেড বহাল, সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার
নতুন বেতন কাঠামোয় বর্তমানের ২০টি গ্রেডই রাখা হচ্ছে। ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে, প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের অনুপাত দাঁড়াবে ১:১.৭৮।
মূল বেতন তিন ধাপে, ভাতা ২০২৮ থেকে
নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ধরা হলেও সরকারি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এই বাস্তবায়ন হবে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে।
অন্যদিকে, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
পেনশনেও পরিবর্তনের প্রস্তাব
নতুন বেতন কাঠামোয় পেনশনভোগীদের সুবিধাও ধাপে ধাপে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাদের নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার কম, তাদের পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি পেনশনধারীদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পেনশনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বৃদ্ধির হার ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে থাকবে।
সরকারি হিসাবে, নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় সাড়ে ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি সুবিধা পাবেন। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন ফিক্সেশন এবং বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
নতুন পে-স্কেলে গ্রেডভিত্তিক মূল বেতন
অনুমোদিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা ও সর্বোচ্চ ১ম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন, অন্যান্য ভাতা-সুবিধা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা, প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত ও ৯ লাখ ২৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুবিধাভোগী উপকৃত এবং অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলে গ্রেড ও এলাকাভেদে বাড়িভাড়া ভাতার হার হবে—
১৬তম থেকে ২০তম গ্রেড
এই গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন। অন্যান্য বড় শহরে এ হার হবে ৫০ শতাংশ।
এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, গাজীপুর সিটি করপোরেশন, কক্সবাজার ও সাভার।
দেশের অন্যান্য এলাকায় এ গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন।
১০ম থেকে ১৫তম গ্রেড
১০ম থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীরা ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন।
অন্যান্য বড় শহরে এ হার হবে ৪০ শতাংশ এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ৩৫ শতাংশ।
৫ম থেকে ৯ম গ্রেড
৫ম থেকে ৯ম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন।
অন্যান্য বড় শহরে এ হার হবে ৩৫ শতাংশ। আর দেশের অন্যান্য এলাকায় বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হবে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ হারে।
১ম থেকে ৪র্থ গ্রেড ও তদূর্ধ্ব
১ম থেকে ৪র্থ গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা পাবেন।
অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় এ হার হবে ৩০ শতাংশ। দেশের অন্যান্য এলাকায় বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হবে মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে।
নতুন পে স্কেলে মূল বেতন
এর আগে গত সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় আগের মতোই ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে।
নতুন পে স্কেলে ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বাড়বে ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত।
নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। তবে বর্ধিত বেতনের আর্থিক সুবিধা একবারে দেওয়া হবে না। তিন ধাপে মূল বেতন সমন্বয় করা হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে এবং পরবর্তী দুই ধাপে অবশিষ্ট অংশ সমন্বয় করা হবে।
অন্যদিকে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
