ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ডে অস্বস্তিতে বিএনপি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে। দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদক দমনের উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও অভিযান পরিচালনার ধরন এবং অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের আশঙ্কা, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কর্মসূচির ইতিবাচক আলোচনা কিছুটা ম্লান হয়েছে।
এদিকে ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ইশরাক দাবি করেছেন, হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য অল্প সময়ের জন্য তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
অস্ত্র হাতে কী ঘটেছিল
গত শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘণ্টি ঘর রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ইশরাকের নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করছেন। এ সময় তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে ইশরাকের একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি দেন।
ভিডিওটি ঘিরে বিএনপির ভেতরেও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামা সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাজ নয়। তাঁদের দায়িত্ব প্রশাসনকে সহযোগিতা করা। তাঁর মতে, এ ঘটনায় দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ইশরাক অবশ্য তাঁর উদ্যোগের পক্ষে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, মাদকের বিস্তার এবং পুলিশের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
তবে বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উদ্দেশ্য ভালো হলেও অভিযান পরিচালনার ধরন উদ্যোগটিকে বিতর্কিত করেছে। মাদক দমনের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে এখন বেশি আলোচনায় এসেছে অস্ত্র প্রদর্শন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির দিনেই বিতর্ক
গত শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা এবং মিরপুর-১০ নম্বরের হকারমুক্ত ফুটপাতসহ ১৩টি স্থান ঘুরে দেখেন তিনি। পরিচ্ছন্নতা ও সেবার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন। কোথাও পরিস্থিতির উন্নয়নে সাত দিন, কোথাও দুই সপ্তাহ সময়সীমা বেঁধে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিদর্শনে থাকা মন্ত্রিসভার এক সদস্যের মতে, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর দিনভর কর্মসূচির ইতিবাচক অর্জন অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। এ ঘটনায় তিনি নিজেও বিব্রত ও বিরক্ত বলে জানিয়েছেন।
সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর মতে, মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাকের অবস্থান সঠিক হলেও অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক শীর্ষ নেতাও মনে করেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভার ওপরও পড়ে।
দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকের বিরুদ্ধে উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই। আপত্তি রয়েছে একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তুলে নেওয়ার ধরন নিয়ে।
ইশরাকের বক্তব্য
সমালোচনার মুখে রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, একটি অস্থায়ী মাদক আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন তিনি।
এলাকায় মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আগে নেওয়া উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং জনবলসংকট দূর করার বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।
তবে অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইশরাক আগে পুলিশের সঙ্গে আলোচনার কথা বললেও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর তিনি পুলিশকে আসতে বলেন।
ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি। পরে তাঁরা এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন। ফলে মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও নির্দিষ্ট অভিযানটির বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে আগাম সমন্বয় ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে আইনি প্রশ্ন
ইশরাকের অস্ত্রটি বৈধ কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি জনসমক্ষে অস্ত্র প্রদর্শনের ধরন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালায় আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের অনুমতির পাশাপাশি অস্ত্র প্রদর্শনের সীমাবদ্ধতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্যের মধ্যে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ইশরাকের ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখবে পুলিশ। রোববার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিষয়টি শুধু অস্ত্রের বৈধতা বা আইনগত প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের বক্তব্য, মাদক দমনে প্রশাসনের ঘাটতি থাকলে তা দূর করতে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নিজে অস্ত্র হাতে অভিযানে যাওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকার পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ
ইশরাক বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটিরও সদস্য। তাঁর অস্ত্র হাতে অভিযানের ছবি ও ভিডিও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দল ও সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন ওই নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি ঢাকার দূতাবাসগুলোর নজরে এসেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের এমন কর্মকাণ্ড কূটনীতিকেরা নেতিবাচকভাবে দেখবেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও উঠেছে। এর মধ্যেই শনিবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পেজে ঢাকা-৬ আসন মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী। মাদক কারবারে নিজের দলের কেউ জড়িত থাকলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
তবে বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়। পুলিশের তদন্তে অস্ত্র প্রদর্শনের আইনগত দিক যাচাই করা হবে। পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ডে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ। এ ঘটনায় তাঁরা যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রত্যাশা করছেন।
