রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর আজ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আজ ২৮ অক্টোবর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ও রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি ২০০৬ সালের এই দিন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় সংঘর্ষে সেদিন সারা দেশে ১৩ জন নিহত হন। রাজধানীতে নিহতদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ছয় নেতাকর্মী এবং ছাত্রমৈত্রীর একজন কর্মী ছিলেন। আহত হন অন্তত এক হাজার মানুষ।
লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে আলোচিত ওই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। প্রায় দুই দশক পরও দিনটি রাজনৈতিক বিতর্ক, বিচার এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্নে আলোচনায় রয়েছে।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। তাঁকে ওই দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দিতে আন্দোলন করছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট।
২৭ অক্টোবর রাতে কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পরদিন ঢাকায় সমাবেশের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে, বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এবং জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ আয়োজনের ঘোষণা দেয়।
সংঘর্ষের আশঙ্কায় পল্টন ময়দান ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। তবে ২৮ অক্টোবর পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে।
জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, তাদের পূর্বনির্ধারিত সমাবেশস্থলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা নিয়ে হামলা চালান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সেদিন প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার কথা উঠে আসে।
সংঘর্ষে প্রাণহানি ও ব্যাপক হতাহতের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগ পরবর্তী সময়েও আলোচনায় এসেছে।
ঘটনার পর পল্টন থানায় হত্যা মামলা করা হয়। ২০০৭ সালে তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছিলেন। পরে পরোয়ানা স্থগিত করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের আগস্টে আদালত মামলা প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করেন। ফলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। ঘটনাটির বিচার না হওয়া নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও আলোচনা অব্যাহত থাকে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, তাঁরা মামলাটি আবার আইনিপ্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, মামলা প্রত্যাহারের পর প্রয়োজনীয় নথির সত্যায়িত অনুলিপি পেতে বারবার আবেদন করেও তাঁরা তা পাননি।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। প্রাণহানি, সহিংসতার দায় এবং মামলার পরিণতি নিয়ে বিতর্কও শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের আইন অনুযায়ী বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হলে নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাবে।
