তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২২ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন দীপ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাকে হেফাজতে নেয় পিবিআই।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দীপকে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত সংস্থাটি। এ সময় তার দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন আলামত খোঁজা হয়। পরে তাকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মধ্যরাতে পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
ঘটনাস্থলে নিয়ে দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই
শুক্রবার দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যায় পিবিআইয়ের তদন্ত দল। তুরাগ নদসংলগ্ন ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশের মাঠে কী ঘটেছিল, তা জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা নিশ্চিত হতে কাগজপত্র ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছিল।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কথা বলার সময় কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাওয়াকারীদের দুজনের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল। তাদের দেখে তাহসিফ দৌড় দেন। একপর্যায়ে তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন বলে দাবি করেন দীপ। অন্যদিকে, দীপ নিজে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পরে সেখান থেকে চলে যান।
তবে ধাওয়াকারীরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি পিবিআই। পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ওই এলাকায় আদৌ পুলিশের কেউ ছিলেন কি না, ইউনিফর্ম পরা কেউ ছিলেন কি না কিংবা সেখানে তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। তারা কেন ওই মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে দীপ বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি সেখানে যাননি বলেও দাবি করেন। পরে মোটরসাইকেলটির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে জানান, তাহসিফ তাকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই এলাকা আগে থেকে তার পরিচিত ছিল না বলেও জানান দীপ।
এ ছাড়া ঘটনার রাতে তাদের সঙ্গে অন্য কেউ বা কোনো নারী ছিলেন কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীপের সঙ্গে তাহসিফের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল।
উদ্ধার নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল
শুক্রবার সকালে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় তুরাগ নদসংলগ্ন একটি মাঠ থেকে কালো রঙের নম্বরপ্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে পিবিআই। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মোটরসাইকেলটি প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে পাওয়া যায়। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
তবে মোটরসাইকেলটির মালিকানা নিশ্চিত করতে কাগজপত্র, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।
কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় নৌ পুলিশ মূল তদন্ত করছে। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই করেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
যেভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফের সঙ্গে দীপকে দেখা যায়। তারা হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় তারা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি চলে যান। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে তাদের রাতের চলাফেরা ও যোগাযোগের বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসে। দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতের একপর্যায়ে তারা টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় যান।
২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে নারাজ। ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে দীপ যে দাবি করেছেন, তা-ও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। তার দাবি, ছেলে সাঁতার জানতেন এবং পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের কোর্সও করেছিলেন। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ওই রাতে তাহসিফের সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং এ ঘটনায় কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা।
