শেষ রাতের সঙ্গী দীপের তথ্যে ধোঁয়াশা, সামনে আসছে নতুন ক্লু
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার রাতে তারা কেন টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকার মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে দীপ বারবার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে কোনো নারী বা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, তাহসিফ ও দীপ কেন ওই মাঠে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও পরিষ্কার তথ্য দিচ্ছেন না তিনি।
তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে মাদক ও নারী সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো সামনে রেখে তদন্ত করছে পিবিআই। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি দুর্ঘটনা—সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের দেওয়া কোনো তথ্যই যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা হচ্ছে না। পাশাপাশি তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
মাঠে যাওয়া নিয়ে দীপের বক্তব্যে অসংগতি
পিবিআই সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা দীপের কাছে জানতে চান, তারা তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকার মাঠে কেন গিয়েছিলেন। জবাবে দীপ বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেন। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, তিনি ওই মাঠে যাননি; তাহসিফ তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি সেখানে যাবেন।
পরে তদন্তকারীরা জানতে চান, দীপ যদি মাঠে না গিয়ে থাকেন, তাহলে মোটরসাইকেলটি মাঠের কোন জায়গায় ছিল, তা তিনি কীভাবে জানেন। এ প্রশ্নের জবাবে নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করে দীপ বলেন, তিনি মাঠে গিয়েছিলেন এবং তাহসিফ তাকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে ওই মাঠ আগে থেকে তার পরিচিত ছিল না বলে জানান তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাঠে যাওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি দীপ। তাদের সঙ্গে কোনো নারী বা অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়েও একই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। এতে তদন্তকারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তবে দীপ শান্তভাবেই নিজের মতো করে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক কর্মকর্তা জানান, টঙ্গীর মাজার বস্তি-সংলগ্ন ওই মাঠে মাদক সেবনের ঘটনা ঘটে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগেও একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। তাহসিফ ও দীপ মাদকসংক্রান্ত কোনো কারণে সেখানে গিয়ে থাকতে পারেন—এমন কিছু সূত্র পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাদক সেবনের জন্য ঢাকা থেকে টঙ্গীর ওই মাঠে যাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলেও দীপ বিভিন্ন উত্তর দিচ্ছেন। তার বক্তব্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
আরেক তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে একজন নারীও ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ওই নারীকে নিয়ে তাহসিফ কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত মাঠে গিয়েছিলেন, নাকি সেখানে যাওয়ার আগে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর বাসা থেকে বের হয়ে তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। এ জন্য তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীপের সঙ্গে তাহসিফের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার কথা হয়। এসব কলের কোনোটি কয়েক সেকেন্ডের, আবার কোনোটি কয়েক মিনিটের। ওই রাতে তাহসিফের ফোনে আরও একাধিক নম্বর থেকে কল আসে এবং তিনিও বিভিন্ন নম্বরে যোগাযোগ করেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করছে পিবিআই।
এদিকে মামলা না হওয়ার বিষয়েও কথা বলেছেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি জানান, নিহতের পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। মামলা হলে সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হবে। পাশাপাশি পরিবার কেন এখনো মামলা করেনি, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
জানাজা ও দাফনে যাননি দীপ বা তার পরিবারের কেউ
শুক্রবার রাতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে দীপের বাবা, ছোট ভাই ও মামাকে দেখা যায়। দীপের বাবা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি। তবে তার মামা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পড়াশোনাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাহসিফ ও দীপের পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাহসিফ দীপের মোহাম্মদপুরের বাসায় যাতায়াত করতেন। ওই বাসায় দীপের ভাই ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল।
তাহসিফের জানাজা ও দাফনে দীপ কিংবা তার পরিবারের কেউ অংশ নিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে দীপের মামা জানান, তাদের কেউই সেখানে যাননি। বন্ধুত্ব ও পারিবারিক পরিচয় থাকার পরও তারা কেন জানাজা ও দাফনে যাননি, এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।
তাহসিফের মৃত্যুর তদন্ত প্রসঙ্গে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদকসংক্রান্ত বিষয় ও নারীসংক্রান্ত বিষয়। এছাড়া এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। আমরা বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। এছাড়া দীপ আমাদের যা বলছে, সব কথাই আমরা বিশ্বাস করছি না। আমরা তার দেওয়া তথ্য যাচাই করছি।’
ময়নাতদন্তের নমুনা পরীক্ষায় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় তার পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সাধারণত তার সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে তিনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতার কেটে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি তাহসিফ মাদক বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় বস্তু গ্রহণ করেছিলেন কি না, পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানার চেষ্টা করা হবে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রতিবেদন পাওয়ার কথা রয়েছে।
যেভাবে সামনে আসে তাহসিফের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ফোন পেয়ে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর তাদের একসঙ্গে দেখা যায়। পরে আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে তারা সেখান থেকে চলে যান।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তারা ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন। তাদের মধ্যে দুজনের পরনে পুলিশের মতো পোশাক ছিল। তাদের দেখে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ পালিয়ে যান বলে দাবি করেন তিনি। তবে ওই ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তা যাচাই করছে পিবিআই।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এটি তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলটির কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগে তাহসিফের বাবা একে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছিলেন, তার ছেলে সাঁতার জানতেন। পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তিনি সাঁতারের ওপর বিশেষ কোর্সও করেছিলেন এবং এর সনদ ছিল। তাই ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়ে দীপের বক্তব্য মানতে নারাজ তিনি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআইকে দীপের দেওয়া তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তাহসিফের বাবা বলেন, ‘না না, এ ধরনের কিছু হতে পারে না। কেন তাকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। আমার ছেলে সাঁতার জানত। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের।’
ঘটনা আড়াল করা বা কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে তো এটাই মনে হয়। তো আর ওকে ধাওয়া দেবে কেন লোকজন, কেন তাকে কেউ ধাওয়া দেবে? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। নদ থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে বলে পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ এক বার্তায় জানান।
তাহসিফের মরদেহ বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। স্থানটি উত্তরখান থানার অধীন। অন্যদিকে মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন। তবে দুটি স্থানের সঙ্গেই তুরাগ নদের সংযোগ রয়েছে।
তাহসিফের বাবা একে এম এনায়েতুল করিমের ভাষ্য, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তার ছেলে। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। তবে বার্তাটি পাওয়ার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানান বাবা।
ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছেন তাহসিফের বাবা। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
