মালয়েশিয়ায় চাকরির নামে ৬-৭ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর আবারও খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। আজ ৩১ অক্টোবর থেকে দেশটিতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের মেডিক্যাল পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রথম দফায় কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর আগেই অভিবাসন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী পাঠাতে দেড় লাখ টাকার কিছু বেশি খরচের প্রাথমিক হিসাব থাকলেও বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে যেতে কর্মীদের কাছ থেকে ৬ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজের ধরন অনুযায়ী কর্মীদের কাছে ৬ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে কারখানার কাজে ৭ লাখ, চিকিৎসাসেবা খাতে সাড়ে ৭ লাখ এবং নির্মাণ খাতে ৬ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। কোনো কোনো এজেন্সি পাসপোর্ট জমা নেওয়ার সময় ১ থেকে ২ লাখ টাকা অগ্রিম নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর আগে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়া যেতে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা, সরকারের নির্ধারিত কোনো অভিবাসন ব্যয় নয়।
তিনি জানান, প্রথমে বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। এরপর বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমেও নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কর্মী পাঠানো শুরু হতে পারে। ১ নভেম্বরের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রস্তুতি শেষ করার আশা রয়েছে। মেডিক্যাল পরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে দুই থেকে চার দিনের মধ্যে প্রথম দফার কর্মীদের যাত্রা শুরু হতে পারে।
মালয়েশিয়া যেতে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অভিযোগের বিষয়ে এজেন্সিগুলো বলছে, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসার খরচ আলাদা। ভিসার ধরন অনুযায়ী ব্যয়ের পরিমাণ কমবেশি হতে পারে। তবে তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায় মালয়েশিয়ার ভিসা করানো কঠিন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুনের মতে, বিদেশে কাজ পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হলে কর্মীদের ঋণের বোঝা বাড়ে এবং তারা শোষণের ঝুঁকিতে পড়েন। তাই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এজেন্সিগুলোর বক্তব্য যা
বেসরকারি এজেন্সিগুলোর দাবি, মালয়েশিয়ায় ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেশটির সংশ্লিষ্ট এজেন্টদেরই বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জানান, একটি নিয়োগাদেশের বিপরীতে মালয়েশীয় এজেন্টকে প্রায় ১০ হাজার রিঙ্গিত কমিশন দিতে হয়। এর সঙ্গে বিমানভাড়া ও মেডিক্যাল পরীক্ষার খরচ যুক্ত হলে একজন কর্মীর মোট ব্যয় ৬ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওই এজেন্সির কাছে প্রায় ১৫ হাজার কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র রয়েছে বলেও তিনি জানান।
সরকারি হিসাবের সঙ্গে কর্মীদের প্রকৃত অভিবাসন ব্যয়ের ব্যবধান আগেও বড় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ভেরিতের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে বাংলাদেশি কর্মীরা গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। গবেষণায় উঠে আসা এই গড় ব্যয় আগের সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে নতুন করে শ্রমবাজার চালুর সময়ও কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নতুন নিয়োগব্যবস্থায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর জন্য মালয়েশিয়া ৩৩৮টি নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে দেশটি সরাসরি ২৫টি মূল রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করেছে। আরও ৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে।
তবে সহযোগী এজেন্সিগুলো মূল এজেন্সি অথবা বোয়েসেলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিয়োগ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে। অর্থাৎ, ৩১২টি এজেন্সি স্বাধীনভাবে সরাসরি কর্মী পাঠাতে পারবে না।
বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হক বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। যে ১০ হাজার কর্মী নেওয়া হবে, তাদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব শিগগির সার্কুলার দেব। কোনো প্রকার দালাল ছাড়াই সরাসরি বোয়েসেলে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য জেনে সঠিক পদ্ধতিতে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।’
মেডিক্যাল পরীক্ষার সরকারি ফি ৮ হাজার টাকা
মালয়েশিয়ায় যেতে দেশটির অনুমোদিত নির্দিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। বর্তমানে মালয়েশিয়া অনুমোদিত প্রায় ১৫টি মেডিক্যাল সেন্টার রয়েছে। এ পরীক্ষার জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি ৮ হাজার টাকা।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ ৩১ অক্টোবর থেকে সরকার অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টারগুলোতে পরীক্ষা শুরু হবে। এর আগে করা কোনো মেডিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদন অভিবাসন ছাড়পত্রের জন্য গ্রহণ করা হবে না। অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর তালিকা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, কিছু দালাল ও অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনহীন মেডিক্যাল পরীক্ষার কথা বলে কর্মীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও টাকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ধরনের প্রস্তাবে সাড়া না দিতে কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল সেন্টার ও রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন যাচাই না করে পাসপোর্ট বা টাকা জমা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
