পুলিশের জন্য কেনা হবে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যানসহ ৫৮৩০ বাহন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ এএম
ফাইল ছবি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের যানবাহন কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যান, সর্বভূমিতে চলাচলযোগ্য এটিভি, মোবাইল কমান্ড সেন্টার, ক্রাইম সিন ভ্যান, স্পিডবোটসহ মোট ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দুটি প্রকল্পের আওতায় এসব যানবাহন সংগ্রহে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬০৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের দীর্ঘদিনের যানবাহন সংকট দূর করা এবং মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম আরও গতিশীল করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটি বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার মাধ্যমে দেশের প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় জনসেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় যানবাহন কম থাকায় নিয়মিত টহল, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনায় বাহিনীটিকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, আধুনিক ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে বিশেষায়িত যানবাহনের বিকল্প নেই। এসব যানবাহন পুলিশের কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যেসব বিশেষায়িত যান কেনা হবে
প্রস্তাবিত প্রকল্পে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী যান বা রায়ট কন্ট্রোল ভেহিকল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া, সংঘর্ষ কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ টহল গাড়ির তুলনায় এসব যান বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য সর্বভূমিতে চলাচলযোগ্য এটিভি কেনা হবে। সাধারণ যানবাহন যেখানে সহজে পৌঁছাতে পারে না, সেখানেও এসব যান ব্যবহার করা সম্ভব।
প্রকল্পে থাকছে মোবাইল কমান্ড সেন্টার। এটি মূলত একটি ভ্রাম্যমাণ নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে কাজ করবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তির সাহায্যে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় এবং অভিযান পরিচালনা করা যাবে।
অপরাধস্থল থেকে দ্রুত আলামত ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য কেনা হবে ক্রাইম সিন ভ্যান। এসব যান তদন্ত কার্যক্রমকে সহজ করার পাশাপাশি অপরাধী শনাক্তে সহায়তা করবে।
এ ছাড়া দেশের বিস্তৃত নদীপথে পুলিশের কার্যক্রম বাড়াতে স্পিডবোট ও দেশীয় নৌকা কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। নৌপথে টহল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং জরুরি উদ্ধারকাজে এসব জলযান ব্যবহার করা হবে।
দুটি প্রকল্পে ব্যয় ৬৬০৮ কোটি টাকা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনা হবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন সংগ্রহ করা হবে। অন্যদিকে, ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা হবে ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন।
২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্প দুটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যয় সরকার বহন করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় প্রকল্প দুটি উপস্থাপনের কথা থাকলেও সভা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সেগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া এগোয়নি। বুধবারের একনেক সভার কার্যতালিকায় প্রকল্প দুটি রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা-১ অধিশাখা) মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজা গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে দুটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এর আওতায় মোট ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনা হবে।
প্রস্তাবিত ব্যয়ের পরিমাণ ৬ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক থানায় মাত্র একটি পিকআপ ভ্যান রয়েছে। সেটি দিয়ে কীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? পুলিশকে প্রয়োজনীয় রসদ না দিলে তারা কীভাবে কাজ করবে? গত একনেক সভা না হওয়ায় প্রকল্প দুটি উপস্থাপন করা যায়নি। তবে পরবর্তী একনেক সভায় এগুলো উপস্থাপন করা হবে।
পুলিশের বর্তমান যানবাহন সংকট
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক পুলিশ স্টেশনে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সেবা দেওয়ার জন্য যানবাহন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি। অর্থাৎ, প্রতিটি থানায় গড়ে দুটি করে যানবাহনও নেই।
এর ওপর বিদ্যমান যানবাহনের প্রায় ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি। ফলে নিয়মিত টহল, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে পুলিশের চলাচল সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি বাড়বে বলে আশা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে অপরাধ দমন, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় বাহিনীটির দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
যানবাহন পরিচালনায় প্রশিক্ষণও
শুধু যানবাহন কেনাই নয়, সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগও রাখা হয়েছে প্রকল্প দুটিতে।
অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ জনকে হালকা যানবাহন চালনা ও মেকানিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া ৩০০ জনকে ভারী যানবাহন চালনা ও মেকানিক প্রশিক্ষণ এবং আরও ৫০ জনকে যানবাহন মেরামতবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের আওতায় ৯১০ জন পুলিশ সদস্যকে ড্রাইভিং ও মেকানিক প্রশিক্ষণ এবং আরও ৫০ জনকে মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পাশাপাশি অপারেশনাল যানবাহন প্রকল্পে যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নতুন যানবাহন সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশের দীর্ঘদিনের পরিবহন সংকট অনেকটা কমবে। একই সঙ্গে দেশের শহর, গ্রাম ও দুর্গম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীটির সক্ষমতা বাড়বে।
