জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল সেনাবাহিনী, জাসদের দাবি সঠিক নয়: সাখাওয়াত
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর তখনকার সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের কৃতিত্ব জাসদের নয় বলে দাবি করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। তার দাবি, জিয়াউর রহমানকে সে দিন টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি ফোর বেঙ্গলও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।
শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি (রাওয়া) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জাসদের বয়ান হচ্ছে, তারাই জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু এই বয়ান সঠিক নয়। জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছিল টু ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি। এ কাজে নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন কর্নেল মহিউদ্দীন। ফোর বেঙ্গলও তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।
অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত বলেন, ৭ নভেম্বর ভোর ৬টার দিকে তিনি টু ফিল্ডে গিয়ে দেখেন, জিয়াউর রহমান ইউনিটটির অধিনায়কের কার্যালয়ে বসে আছেন। তার পাশে ছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন্স (ডিএমও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরউদ্দীন খান। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর কর্নেল তাহের গণবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে টু ফিল্ডে আসেন। সেখানে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার কথা হয়। তাহের জিয়াকে তাদের সঙ্গে যেতে এবং সৈনিকদের সামনে তাদের ২১ দফা বা ১৭ দফা দাবি মেনে নেওয়ার কথা বলতে বলেন। তবে জিয়াউর রহমান তাতে রাজি হননি।
তিনি আগেই রেডিও ও টেলিভিশনে নিজের বক্তব্য পাঠিয়ে দিয়েছেন তুলে ধরে কোথাও যেতে অস্বীকৃতি জানান, বলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাখাওয়াত।
জিয়াউর রহমানকে একবার বাইরে নিয়ে যেতে পারলে তিনি আর ফিরে আসতেন না। এতে কর্নেল তাহের ও জাসদের একাংশ নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারত, দাবি করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানকে উদ্ধারে টু ফিল্ড ও ফোর বেঙ্গলের ভূমিকার কথা তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ওই দুটি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা তাকে অন্য কোথাও যেতে দেননি এবং টু ফিল্ড তাকে আগেই উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাখাওয়াত হোসেন তৎকালীন কিছু অমীমাংসিত রহস্যের প্রসঙ্গও সামনে আনেন।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ওই উত্তাল সময়ে কর্নেল হুদা কেন সম্পূর্ণ একটি ব্যাটালিয়ন (১০ বেঙ্গল) নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন, তা আজও বড় রহস্য।
মূলত জাসদের গণবাহিনীর পাশাপাশি কর্নেল হুদাদের এমন সামরিক পদক্ষেপের পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, ইতিহাসের সেই অজানা দিকটি তুলে ধরতেই এ প্রসঙ্গ টানার কথা বলেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের সততা ও সাহসিকতা ছিল অনন্য। তিনি হকি মাঠে লোডেড রাইফেল হাতে থাকা উচ্ছৃঙ্খল ট্রুপসদের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে তাদের শান্ত করেন। তার মনে কোনো প্রতিশোধস্পৃহা ছিল না।
খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা এবং হায়দারকে বাঁচানোর জন্য তিনি নওয়াজেশ উদ্দিনকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন তুলে ধরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাখাওয়াত বলেন, সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যকার বিভেদ দূর করে মেজর জিয়া রিকনসিলিয়েশন বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে এসে স্বাধীন নীতির সূচনা করেন তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথম দেশ হিসেবে তিনি চীন সফর করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে আল কুদস কমিটিতে ভূমিকা রাখেন।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আজ পর্যন্ত ঠিক করতে পারিনি। আমরা অনেক বছর ভারতকেন্দ্রিক থেকেছি। আমি কেন পার্শ্ববর্তী ভারতে দায়ী করব, ভারতীয় হলে আমিও তাই করতাম।
বাংলাদেশের সেই সাহস নেই দাবি করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যদিও ইরানের সাথে আমাদের তুলনা চলে না, কিন্তু আমাদের উচিত তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া।
স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদেরও শর্তযুক্ত বিদেশি ঋণ পরিহার করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং স্বাধীনভাবে জাতীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গত ১৫ বছরে সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব ও নৈতিকতা ধ্বংস করা হয়েছে মন্তব্য করে সাখাওয়াত বলেন, একটি দেশকে শক্তিশালী করতে হলে সেনাবাহিনীকে পুনরায় চরম পেশাদারত্বে ফিরে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান বীর প্রতীক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ড. ইউনূসকে আমি এখনো দাঁড়িয়ে বলবো সবার সামনে, উনি মস্ত বড় একটা অপরাধ করে গেছেন। তড়িঘড়ি করে অল্প সময়ের মধ্যে ইলেকশনটা দিয়ে জাতির ক্ষতি করে দিয়ে গেছেন। এটা তো আপনার ম্যান্ডেট ছিল না।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনতা এবং ছাত্ররা আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। আপনি কথা দিয়েছেন সংশোধন করবেন, স্বৈরাচারদের বিচার করবেন, হত্যার বিচার করবেন। এই কাজগুলো তো করলেন না। হঠাৎ করে আপনি রাজনৈতিক দলের চাপে নির্বাচন দিলেন।
একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কথায় কান দিয়ে সংস্কার না করেই মুহাম্মদ ইউনুস জাতির ক্ষতি করেছেন বলে মন্তব্য করেন এ বীর প্রতীক।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ভূরাজনীতি গবেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. আমিনুল করিম, রাওয়া চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আবু রুশদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. দেলোয়ার হোসেন খান প্রমুখ।
