ভোট : গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পরীক্ষা
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
ছবি: রাসেল আহমদ
আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে সকাল সাড়ে সাতটায় শুরু হয়েছে। কিন্তু ভোটের দিনকে সামনে রেখে গতরাত থেকে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের ওপর সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন দ্বায়িত্বশীল গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া খবরগুলো যেন হতাশা আর আতংকের কালো ছায়ায় আমাদের প্রত্যাশাকে ঢেকে দিতে চেয়েছে বারবার।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা, ফরিদপুর ও নারায়ণগঞ্জে ব্যালট পেপার ও সিলের অপব্যবহার, এবং নির্বাচনী সরঞ্জামসহ জাল ভোটের অভিযোগ,এসব ঘটনার মাধ্যমে জামায়াতের অপতৎপরতা প্রকাশ পেয়েছে। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতার হুমকিমূলক মন্তব্য ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা আরও উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকের মতো আমারও বিশ্বাস, নির্বাচন কমিশনই দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্রয় বা নীরবতার মাধ্যমে এসবে পরোক্ষ সহযোগিতা প্রদর্শন করে আসছে। যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতায় গভীর প্রশ্ন তুলেছে। তবুও বিএনপির তৎপরতা এবং জনসচেতনতার চাপের মুখে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছু একশন নিয়েছে।রাজধানী ও অন্যান্য এলাকায় নির্বাচনী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে আটক ও কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিছু কেন্দ্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, নির্বাচনী সামগ্রী সুরক্ষা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ ইতিবাচক প্রমাণ দিয়েছে।
আজকের ভোট কেবল প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের পরীক্ষা নয়; এটি দেশের চলমান গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির, অন্তর্বর্তী সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের দায়ভার নির্ধারণের মঞ্চ। তবে ভোটারের প্রত্যেক পদক্ষেপই পারে এই প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলাতে। আজকের দিনে ভোট দানের পরিবেশের উপর নির্ভর করছে, হারানো বিশ্বাস পুনর্গঠন করবে নাকি বিতর্ক ও অবিশ্বাসকে আরও জোরালো করবে।
মনে রাখা উচিৎ, আজকের দিনটি কেবল একটি নির্বাচন-পর্বের সমাপ্তি নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের পুনর্নির্মাণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ব্যালট বাক্সের ভেতর যে কাগজটি পড়েছে, সেটি কেবল একটি প্রতীকে সমর্থন নয়-এটি আস্থা, ক্ষোভ, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ-দাবির সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার পালাবদলে নয়; বরং সেই প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতায়, যেখানে পরাজিতও ফলাফল মেনে নিতে পারেন এবং বিজয়ীও সংযত থাকেন। একটি নির্বাচন তখনই সফল হয়, যখন তা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে বৈধতা দেয়, সামাজিক বিভাজনকে নয়।
বাংলাদেশের মতো বহুধা বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনের দিনটি স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনাপূর্ণ। কিন্তু উত্তেজনা যেন কখনও অনিশ্চয়তায়, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনও প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়। ভোটারদের উপস্থিতি গণতন্ত্রের প্রাণ; তবে সেই উপস্থিতি যদি ভয়ভীতি, প্রশাসনিক প্রভাব, অর্থবল কিংবা সহিংসতার ছায়ায় আবৃত থাকে, তাহলে সংখ্যাগত অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারে না। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা তাই কেবল সাংবিধানিক দায় নয়,এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
ইতিমধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি পরিমণ্ডলে যে প্রশ্ন, সংশয় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বৃহত্তর ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে (৯ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত এক কংগ্রেসনাল ব্রিফিং থেকে শুরু করে ঢাকায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত জরিপ-সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, এই নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার সংকট গভীর।
ঢাকায় সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) প্রকাশিত গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। যদিও ৮৮.৭ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন, প্রায় ৫০.৭ শতাংশ নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং ২৫.৮ শতাংশ নিজেদের চরম অনিরাপদ মনে করেন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সংবিধানে সমতা ও বৈষম্যহীনতার অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের নির্বাচনী অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রায়শই ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি নগণ্য।
এমন প্রেক্ষাপটে একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে কার্যত বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ? সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্নটি। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে নারীদের পূর্ণ, সমান ও কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো গণতন্ত্রই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) লক্ষ্য ৫-এ লিঙ্গসমতা এবং লক্ষ্য ১৬-এ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা সরাসরি নির্বাচনী পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতিসংঘ নারী (UN Women) ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্পষ্টভাবে বলেছে নারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা, অনলাইন ও অফলাইন হয়রানি, চরিত্রহনন, সামাজিক চাপ ও লিঙ্গভিত্তিক ভয়ভীতি বন্ধ না করলে গণতন্ত্র কেবল আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থাকে। ভোটকেন্দ্রে নারী ভোটার, নারী প্রার্থী বা নারী নির্বাচনকর্মী যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, তাহলে সেই নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও নৈতিকভাবে অপূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশে নারীরা দীর্ঘদিন ধরেই ভোটার হিসেবে সক্রিয়; অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের উপস্থিতি পুরুষদের তুলনায় বেশি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তর, নির্বাচনী প্রচার বা অর্থায়নের কাঠামোয় নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। নির্বাচনের দিন নিরাপদে ভোট দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি রাজনীতির প্রতিটি স্তরে নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটি কেবল ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের মানোন্নয়নের শর্ত।
শুধু নারীরাই নন,সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী নাগরিক, তরুণ ভোটার, প্রবাসী ভোটার কিংবা কারাবন্দি নাগরিক-প্রত্যেকের ভোটাধিকার সমান মর্যাদার দাবিদার। গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতায়, কিন্তু তার মর্যাদা সংখ্যালঘুর নিরাপত্তায়। কোনো নাগরিক যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নির্বাচনের আগে বা পরে হয়রানির শিকার হন, তবে সেই নির্বাচন সামাজিক আস্থার সংকট তৈরি করে। নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিহিংসা, মামলা-হামলা, দখল বা চাঁদাবাজির সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, জনগণের রায়কে কলুষিত করে।
আজ ভোটে সম্ভাব্য বিজয়ী পক্ষের জন্য তাই এই মুহূর্ত থেকেই আত্মসংযমের পরীক্ষা শুরু। ক্ষমতায় যাওয়া মানে রাষ্ট্রকে দলীয়করণ নয়; বরং রাষ্ট্রকে সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখা। বিরোধী মতকে দমন করা সহজ, কিন্তু তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না।
যারা পরাজিত হবেন, তাদের দায়িত্ব কম নয়। ভোট শেষে ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ থাকলে তার সাংবিধানিক ও আইনি পথ রয়েছে। রাজপথে অনির্দিষ্ট সংঘাতের চেয়ে আদালত ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের পথই গণতন্ত্রকে রক্ষা করে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতা এখানেই। ক্ষমতা হারিয়েও প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার না করা, আর ক্ষমতা পেয়েও বিরোধী কণ্ঠকে নিশ্চিহ্ন না করা।
আজকের এ নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতি, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেরও মুহূর্ত। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সামাজিক বৈষম্য,এসব বাস্তব সংকটের সমাধান কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমেই সম্ভব। একটি প্রশ্নবিদ্ধ বা বিতর্কিত নির্বাচন অর্থনৈতিক আস্থাকেও নড়বড়ে করে দেয়। বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক,সবকিছুর ভিত্তি হলো একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো। সুতরাং নির্বাচন-পরবর্তী সময়টিতে দায়িত্বশীল আচরণ কেবল রাজনৈতিক শালীনতার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার দাবিও।
ভোটের এই দিনে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, তথ্য যাচাই, অনিয়মের প্রতিবেদন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের পক্ষে জনমত গঠন-এসবই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। তবে দায়িত্বজ্ঞানহীন গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলতে পারে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রাণ, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত থাকে দায়িত্ববোধ।
সবশেষে ফিরে আসা যাক মূল প্রশ্নে,এই নির্বাচন আমাদের কী দেবে? কেবল একটি সরকার, নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি? ইতিহাসের বহু বাঁকে আমরা দেখেছি, নির্বাচনের ফলাফল সাময়িক; কিন্তু তার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। যদি আজকের দিনটি প্রমাণ করতে পারে যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে ভয়মুক্ত পরিবেশ দিতে সক্ষম, নারীরা সমান মর্যাদায় ভোট দানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটে অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সকল রাজনৈতিক দল সংযত এবং দায়িত্বশীল,তবে সেটিই হবে প্রকৃত অর্জন।
ভোটের দিন শেষ হবে আজ সূর্যাস্তের সঙ্গে। কিন্তু গণতন্ত্রের পরীক্ষা চলবে প্রতিদিন। সংসদে, আদালতে, প্রশাসনে, রাজপথে এবং নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। আজকের ব্যালট যদি আগামী দিনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, যদি ক্ষমতা জনস্বার্থের সেবায় নিয়োজিত হয়, যদি নারীর কণ্ঠ রাজনৈতিক প্রান্তিকতা থেকে মূলধারায় উঠে আসে,তবেই এই নির্বাচন অর্থবহ হয়ে উঠবে।
ইতিহাস আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ, যেখানে গণতন্ত্র কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়, একটি চর্চা। কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, একটি সংস্কৃতি। কেবল একটি ফলাফল নয়, একটি নৈতিক মানদণ্ড।
আজকের প্রত্যাশা একটাই-ভোট যেন কেবল গণনা না হয়, গণবিশ্বাসে রূপ নেয়। ক্ষমতা যেন কেবল দখল না হয়, দায়িত্বে পরিণত হয়। আর গণতন্ত্র যেন কেবল উচ্চারণে নয়, বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
