রংপুরে চার খুন, পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে পুলিশ ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কথা জানালেও নিহতের স্বজনেরা পুলিশের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
গত শনিবার রাতে একটি নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে স্থানীয় দুই তরুণকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি পুলিশের।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি দেখে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়।
গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী ও মেয়ে সেখানে আসার চেষ্টা করলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। পরে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ছেলে আয়ুশকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও বলেছে, পরিবারের সঙ্গে আগে থেকেই দুই তরুণের পরিচয় ছিল। হত্যার ঘটনা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাঁরা পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেন।
হত্যার পরও কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন অভিযুক্তরা। পুলিশ দাবি করেছে, তাঁরা সেখানে গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে খাবার খান এবং ইয়াবা সেবন করেন। পরে জুমার নামাজের সময় আশপাশের এলাকা ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। যাওয়ার আগে বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দিয়ে ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করেন।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না নিহতদের স্বজনেরা। তাঁদের প্রশ্ন, দুই তরুণ কীভাবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করতে পারেন।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী বলেন, পুলিশ যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা তাঁদের কাছে পরিষ্কার নয়।
গণপতির জামাতা বিশ্বজিৎ রায়ও পুলিশের বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকে দুই তরুণের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাসও ছেলের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর দাবি, ছেলে নেশা করলেও কাউকে হত্যা করতে পারে এমনটা তিনি মনে করেন না। একই ধরনের কথা বলেছেন মুগ্ধের মা সেনা দাসও।
পরিবারের স্বজনেরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতেও প্রীতিলতার সঙ্গে তাঁদের কথা হয়েছিল। এরপর শনিবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া না পেয়ে তাঁরা বাড়িতে যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে অগোছালো অবস্থা দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে আয়ুশের মরদেহ পাওয়া যায়। সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ। আর তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ।
একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় রংপুরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর হত্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। তারা দ্রুত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে। বক্তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
নিহত পরিবারের স্বজনদের প্রশ্ন, যাদের কোনো প্রকাশ্য শত্রু ছিল না, তাদের কেন হত্যা করা হলো? পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ বা ব্যক্তি জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের দাবি ও স্বজনদের সন্দেহ—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
