যে গ্রামে মানুষের ঘুম ভাঙে পাখির কিচিরমিচির ডাকে
এন এ রবিউল হাসান লিটন, বোদা (পঞ্চগড়)
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছের ডালে ডালে শুরু হয় পাখিদের কিচিরমিচির। কোথাও মা পাখি ছানার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে, কোথাও আবার ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে পানকৌড়ি। বক, শামুকখোল, রাতচরা, ঘুঘুসহ নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। এমন দৃশ্যের দেখা মেলে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নাজিরপাড়ায়।
বোদা পৌরশহরের ছিমছাম ও পরিপাটি এই গ্রামটি প্রায় এক যুগ ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শত শত দেশি-বিদেশি পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। পাখিদের আগমনের অপেক্ষায় থাকেন গ্রামের বাসিন্দারাও। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দেই যেন প্রতিদিন ঘুম ভাঙে তাদের।
গাছের ডাল আর বাঁশঝাড়জুড়ে পাখিদের বাসা। কোথাও ডিমে তা দিচ্ছে মা পাখি, আবার কোথাও ছানাদের নিয়ে ব্যস্ত তারা। আর নিচে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন গ্রামের মানুষ। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারাও যেন নীরব প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর জুন-জুলাই মাসে নাজিরপাড়ায় আসতে শুরু করে এসব পাখি। গাছের ডালে বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে এবং ছানা ফোটায়। বংশবিস্তার শেষে প্রায় ছয় থেকে সাত মাস অবস্থান করে নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে তারা আবার নিজেদের আবাসস্থলে ফিরে যায়।
বছরের পর বছর একই নিয়মে পাখিদের এই আসা-যাওয়া চলছে। নিরাপদ পরিবেশ ও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়ায় পাখিগুলোও যেন নাজিরপাড়াকে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছে।
শীতের আগে পাখিরা যখন গ্রামে আসতে শুরু করে, তখন বদলে যায় নাজিরপাড়ার চিত্র। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের ডানা ঝাপটানো আর কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকে চারপাশ। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে এখন দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। অনেকে পাখিদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
পাখিদের নিরাপদ আবাস ধরে রাখতে গ্রামের মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে কেউ পাখি শিকার করতে এলে তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা মিলে তাদের বাধা দেন। পাখিদের কেউ যেন বিরক্ত বা শিকার করতে না পারে, সে বিষয়ে সবসময় সতর্ক থাকেন তারা।
নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম রাজু বলেন, প্রায় দুই যুগ ধরে প্রতিবছর এসব পাখি এখানে আসে। বাইরে থেকে অনেকেই পাখি শিকার করতে এলেও গ্রামের তরুণ ও অভিভাবকেরা মিলে তা প্রতিহত করেন।
তিনি বলেন, ‘সকালে পাখির ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে। পাখিগুলো এখন আমাদের পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছে।’
তবে পাখির অবাধ বিচরণে কিছুটা ভোগান্তিও পোহাতে হয় গ্রামবাসীকে। পাখির মলমূত্রে রাস্তা ও আশপাশের পরিবেশ নোংরা হয়ে যায়। দুর্গন্ধও ছড়ায়। পৌরসভা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্লিচিং পাউডার ছিটানোর ব্যবস্থা করা হলে এ সমস্যা কমবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
নাজিরপাড়ার বাসিন্দা আবছারুল আমিন বলেন, পাখির কারণেই নাজিরপাড়া এখন আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের কলকাকলিতে পুরো গ্রাম মুখরিত থাকে। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন।
তিনি বলেন, গ্রামের মানুষও পাখিদের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিয়মিত খাবার দেন। তবে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর কারণে পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকেও প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বোদা পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক শহীদ গোলাম কিবরিয়া সেলিম বলেন, শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশে আসে। খাবারের সহজলভ্যতা, বংশবৃদ্ধির সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশের কারণে কোনো কোনো এলাকায় তারা প্রতিবছর ফিরে আসে। বংশবিস্তার শেষে উপযুক্ত আবহাওয়া ফিরে এলে তারা আবার নিজেদের আবাসস্থলে চলে যায়।
তিনি জানান, এসব পাখি শামুক, ছোট মাছ ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় খেয়ে জীবন ধারণ করে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
রংধনু কিন্ডারগার্টেনের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আহাম্মেদ মিনহাজ ইহান বলেন, ‘পাখিরা আমাদের অতিথির মতো। আমরা তাদের খাবার দিই। প্রতিবছর পাখিরা এলে আমাদের অনেক ভালো লাগে।’
বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, নাজিরপাড়া প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি এখানে এসে বাসা বাঁধে ও বংশবিস্তার করে।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার এলাকাটি পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সচেতন করা হয়েছে। স্থানীয়রাও পাখিগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিক। কেউ যাতে পাখিদের বিরক্ত না করে, সে বিষয়ে বাইরের দর্শনার্থী ও পর্যটকদেরও সচেতন করা হচ্ছে।
পাখিরা যে গাছগুলোতে বাসা বাঁধে, সেসব গাছ সংরক্ষণের জন্যও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধ করা হয়েছে।
নাজিরপাড়ার গাছপালা আর পাখিদের এই সহাবস্থান যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নীরব চুক্তি। পাখিরা আসে, সংসার গড়ে, ছানা বড় করে আবার ফিরে যায়। আর তাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকে পুরো গ্রাম। এভাবেই বছরের পর বছর নাজিরপাড়া হয়ে উঠেছে পাখিদের নিরাপদ ঠিকানা—যেখানে অতিথি হয়ে আসা পাখিরাও ধীরে ধীরে পরিবারেরই একজন হয়ে গেছে।
