আজ রথযাত্রা, সম্প্রীতির বন্ধনে শুরু মহোৎসব
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে উদযাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে রথযাত্রা, পূজা-অর্চনা, নামসংকীর্তন ও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের। ভক্তদের বিশ্বাস, এদিন ভগবান জগন্নাথ, ভ্রাতা বলরাম ও ভগিনী সুভদ্রা রথে চড়ে মন্দির থেকে বের হয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আসেন। তাই এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবিক ঐক্যেরও প্রতীক।
রথযাত্রার ইতিহাস বহু প্রাচীন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ভারতের ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে ঘিরেই এ উৎসবের সূচনা। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে জগন্নাথদেবের মূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শর্ত ছিল, ২১ দিন পর্যন্ত নির্মাণকক্ষের দরজা খোলা যাবে না। কিন্তু ১৪ দিনের মাথায় কোনো শব্দ না পেয়ে রানি গুণ্ডিচার অনুরোধে রাজা দরজা খুলে দেন। তখন দেখা যায়, জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তির হাত-পা অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং বিশ্বকর্মা অন্তর্ধান করেছেন। পরে স্বপ্নে জগন্নাথদেব রাজাকে জানান, তিনি এই রূপেই পূজা গ্রহণ করবেন।
আরেকটি বিশ্বাস অনুযায়ী, মথুরায় চলে যাওয়ার পর বৃন্দাবনের বাসিন্দারা শ্রীকৃষ্ণের বিরহে কাতর হয়ে পড়েন। তাদের আকুলতা দেখে শ্রীকৃষ্ণ বলরাম ও সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথে চড়ে বৃন্দাবনে ফিরে যান। সেই পুনর্মিলনের স্মৃতিও রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
পুরীর রথযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ হলো গুণ্ডিচা মন্দিরে যাত্রা। ভক্তদের মতে, এটি জগন্নাথদেবের ‘মাসির বাড়ি’। প্রতি বছর মূল মন্দির থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের এই মন্দিরে গিয়ে সাত দিন অবস্থান করেন তিনি। এরপর উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে আবার মূল মন্দিরে ফিরে আসেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভক্তিভরে রথের দড়ি টানলে পুণ্য অর্জিত হয় এবং জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তির পথ সুগম হয়। পাশাপাশি এই উৎসব সমাজে সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ‘জগন্নাথ’ অর্থ জগতের নাথ বা প্রভু। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, জাতি-বর্ণ বা সামাজিক অবস্থানের কোনো বিভেদ নেই। তাই রথের দড়ি টানার অধিকার সবার জন্য সমান।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশ এবারও ৯ দিনব্যাপী রথযাত্রা মহোৎসবের আয়োজন করেছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ ইসকন মন্দিরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হবে। বিকেল ৩টায় সেখান থেকে রথযাত্রা বের হয়ে জয়কালী মন্দির, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলার মোড়, পল্টন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও পলাশী মোড় ঘুরে সন্ধ্যায় শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পৌঁছাবে। আগামী ২৪ জুলাই একই পথে অনুষ্ঠিত হবে উল্টো রথযাত্রা।
আরো পড়ুন : দুপুরের মধ্যে ৮ জেলায় ঝড়-বজ্রবৃষ্টির সতর্কতা
ইসকন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পুরীর পর ঢাকার রথযাত্রাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বছর দেশের ১২৮টি স্থানে ইসকনের উদ্যোগে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
সম্প্রতি স্বামীবাগ মন্দিরে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ইসকন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী জানান, রথযাত্রাকে ঘিরে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি প্রায় ৫০০ স্বেচ্ছাসেবকও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকবেন।
রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী তাঁতিবাজার শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউ ঠাকুর মন্দির থেকেও আজ বিকেল ৪টায় রথযাত্রা বের হবে। শোভাযাত্রাটি তাঁতিবাজার, বংশাল, নবাবপুর, জনসন রোড, রায়সাহেব বাজার ও লক্ষ্মীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এখন রথযাত্রা উদযাপিত হয়। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের উদ্যোগে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে প্রথম আন্তর্জাতিক রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনসহ বিশ্বের বহু শহরে এ উৎসব পালিত হচ্ছে।
