ঈদ নয়, সেটি ছিলো ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’
ফেরদৌস আরেফীন
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি মুক্তি পান এবং ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। এর মাত্র ১ মাস ১০ দিন পর, ১৯৭২ সালের ২৭শে জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার, স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রথম ঈদ- পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। এটি ছিলো একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনা- এই দুই অনুভূতি মিলেমিশে তা ছিলো যেন এক অদ্ভুত ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’।
মাত্র ৪১ দিন আগে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।
দেশের অবকাঠামো ছিলো ধ্বংসপ্রায়, চারপাশে
লাশের গন্ধ, মাটি
খুঁড়লেই বেরিয়ে আসছিলো গণকবর আর কঙ্কাল।
এমন একটি সময়ে, যখন
মানুষ তাদের নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ব্যস্ত, ঠিক
তখনই ঈদ এসেছিলো।
অগণিত পরিবারের সদস্যরা, স্বজনরা
জানেন না তাদের পরিবারের সদস্যরা আদৌ ফিরে আসবেন কিনা।
নাকি চিরতরে চলে গেছেন জীবন নদীর ওপারে।
বধ্যভূমির পর বধ্যভূমি খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিখোঁজ মানুষের স্বজনরা।
দুচোখে অসীম প্রতীক্ষা, যদি
ফিরে আসে স্বজন।
যদি নিয়তির অবরুদ্ধ পথ ভেঙে এসে হাজির হয় চিরচেনা প্রাণের বন্ধু, স্বজন,
পরিবারের সদস্যরা।
এই যে অপেক্ষা আর চিরন্তন পরীক্ষা, দুয়ে
মিলে আনন্দ আর বিষাদে রাঙা ছিলো সেবারের ঈদ।
ঈদের মাত্র ১৭ দিন আগে (১০ জানুয়ারি) বঙ্গবন্ধু
স্বদেশে ফেরেন।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক
বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।
এরপর ১২ জানুয়ারি তিনি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফেরার পর প্রথম ধর্মীয় উৎসব ছিলো এই ঈদুল আজহা।
সেদিন তাঁর উপস্থিতি
বাঙালি জাতির জন্য যেন হয়ে উঠেছিলো এক বিশেষ আশীর্বাদস্বরূপ।
ঈদের আগের দিন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশ্যে পৃথক বাণী দেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁর বাণীতে বলেছিলেন, ‘ঈদুল
আজহা আমাদের আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়।
বাংলাদেশের সাহসী মানুষ দেশকে স্বাধীন করার জন্য সম্পদ ও রক্ত দিয়ে চরম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন।’
রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ঈদ উপলক্ষে দেওয়া তাঁর বাণীতে বলেন, ‘আজিকার ঈদ উৎসবের নয়, বেদনার ঈদ। সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক পরিবারই প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় শোকাভিভূত। ঈদের দিন সেই ব্যথা আরও গভীরভাবে পরিব্যাপ্ত। তাই এবারকার ঈদ অত্যন্ত শান্ত এবং ভাবগম্ভীর পরিবেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠানরূপে পালন করা উচিত।’
এদিন ঢাকায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো আউটার স্টেডিয়ামে। আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ঈদ জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। ওই ঈদের জামাতে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীসহ মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানীসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ঈদের জামাতের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার জন্য মোনাজাতে বিশেষ দোয়া করা হয়। একইসঙ্গে মোনাজাতে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। ঈদের নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ঈদের জামাতে শরীক হওয়া মুসল্লিদের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ঈদ উপলক্ষে বঙ্গভবনের প্রধান ফটক জনসাধারণের জন্য এদিন উন্মুক্ত ছিলো। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বঙ্গভবনে আগত বহু সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন।
ঈদের দিন সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধানমন্ডি ক্লাব ময়দানে (ধানমন্ডি
ঈদগাহ মাঠ) ঈদের
নামাজ আদায় করেন।
নামাজে ইমামতি করেন হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ যাকারিয়া।
এই জামাতকে কেন্দ্র করে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
নামাজের সময় হলে ইমাম সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেও বঙ্গবন্ধু তখনও উপস্থিত হননি।
এক সরকারি কর্মকর্তা ইমামকে বঙ্গবন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে অনুরোধ করলে ইমাম যাকারিয়া উত্তরে
বলেন, ‘নামাজে কোনো প্রধান অতিথি নেই।’
ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু মাঠে প্রবেশ করেন এবং ইমামের এই কথা
তিনি শুনতে পান।
নির্ধারিত সময়েই নামাজ আদায় করা হয়, এবং
নামাজ শেষে বঙ্গবন্ধু ইমামকে বলেন, ‘আপনি
ঠিকই বলেছেন, নামাজে
কোনো অতিথি নেই।’ পরে বঙ্গবন্ধু ইমাম যাকারিয়াকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলকে কোরআন শিক্ষার দায়িত্ব দেন।
নামাজ শেষে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক
সহকর্মী এবং সাধারণ মানুষের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের তাঁর বাসভবনে দেশ-বিদেশের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি, রাজনৈতিক
নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ তাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে আসেন।
সেখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিলো, কারণ
বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য হাজারো মানুষ ভিড় করেছিলো।
ঈদের দিনেও বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিলো। এদিন তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানকে
অবশ্যই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে হবে এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নির্ভর করবে এর ওপর।’
তিনি আরো মন্তব্য করেন যে, পাকিস্তান
ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানি ও ফ্রান্সের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেয়েও কঠিন হবে। ঈদের আনন্দঘন পরিবেশেও তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করতে ভোলেননি।
জানুয়ারি মাস জুড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল।
যুদ্ধের সময় নির্যাতিত নারীদের হাসপাতালে গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিলো।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার যুবরাজ সদরুদ্দিন আগা খান বঙ্গবন্ধুকে ঈদের শুভেচ্ছা পাঠান, এবং
বঙ্গবন্ধু তার জবাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
১৯৭২ সালের এই ঈদটি বঙ্গবন্ধুর জন্য একইসাথে ব্যক্তিগত, মানবিক
ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের এক অনন্য মিশেল ছিলো।
একদিকে তিনি সদ্যস্বাধীন একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন, অন্যদিকে
দীর্ঘ কারাবাসের পর সপরিবারে ঈদ উদযাপনের আবেগও প্রবল ছিলো।
তাঁর উপস্থিতি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছিলো।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদুল আজহা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব ছিলো না; এটি
ছিলো জাতির সামষ্টিক চেতনা, ত্যাগের
মহিমা এবং নতুন করে জেগে ওঠার প্রতীক।
এই ঈদ আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও চিত্র তুলে ধরে। আমরা জানতে পারি, ইমাম যাকারিয়ার প্রতি বঙ্গবন্ধুর সম্মান প্রদর্শন প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি ধর্মীয় রীতিনীতি ও আলেমদের যথাযথ মর্যাদা দিতেন। আমরা অনুধাবণ করতে পারি, ’৭২ সালের সেই ঈদুল আজহায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ছিলো ঐক্যের প্রতীক;
তাঁর নেতৃত্বে জাতি নতুন উদ্যমে দেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলো। আমরা অনুভব করতে পারি, সেই ঈদ যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত একটি জাতির মনে কেমন করে একইসাথে আনন্দ ও বেদনার অনুভূতির
জটিল মিশ্রণ তৈরি করেছিলো।
ঈদ পরবর্তী কর্মদিবস ২৯ জানুয়ারি (শনিবার)
দৈনিক বাংলা
পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ঈদ উদযাপনের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো ‘আনন্দের
পাশাপাশি মূর্ত হয়েছিলো শোক আর বেদনার প্রতিচ্ছবি’।
এই প্রতিবেদনে লেখা ছিলো- ‘গত
বৃহস্পতিবার সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে ঈদ উল আযহা উদযাপিত হয়েছে।
এবার ঈদের আনন্দের পাশাপাশি মূর্ত হয়ে উঠেছে শোক আর বেদনার প্রতিচ্ছবি।
স্বজন হারানোর ব্যথা বদনায় শোকাতুর বাংলার মানুষ এবার ঈদ পালন করেছে।
শত শোকাচ্ছন্ন মুহূর্তের মধ্যেও ঈদের উৎসব এসেছে এক অনির্বাণ জ্যোতি নিয়ে।
বাংলার ঘরে ঘরে ঈদ শত দুঃখ বেদনা আর শোকের
মাঝেও প্রদীপ্ত।’
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ঈদে তথা ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর ঈদুল ফিতরের আগের দিন সাপ্তাহিক ‘জয়
বাংলা’ পত্রিকায়
যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যে বানী দিয়েছিলেন তা ছিলো এমন- ‘আমাদের
দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে।
দখলীকৃত এলাকায় শত্রুসৈন্যের তাণ্ডব চলছে, লক্ষ
লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছেন।
মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, রক্তের
বিনিময়ে মানুষ মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম করছে।
এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে
শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয়
সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা
আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন
আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব।’
’৭২-এর
২৭ জানুয়ারির সেই ঈদুল আজহায় ঠিক যেন তাজউদ্দীনের সেই বাণীরই প্রতিফলন হয়েছিলো আমাদের জাতীয় জীবনে।
আমরা বিজয় অর্জনের পাশাপাশি দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিলাম।
আর তাই মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদে ছিলো মুক্তির আনন্দের সঙ্গে উৎসবের পরিপূর্ণ রেশ।
মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানোর বেদনার তাজা স্মৃতির মাঝে একটুখানি উপশম ছিলো এই ঈদ।
যদিও সেই উপশম আদৌ সম্ভব না,
কিন্তু তবুও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদ এসেছিলো মুক্তি আর উৎসবের বার্তা নিয়েই।
১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারির ঈদুল আজহা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
এটি ছিলো স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণ, বঙ্গবন্ধুর
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, এবং
জাতির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্য সঙ্গম।
এই দিনের ঘটনাবলি আমাদের শেখায় কীভাবে ত্যাগ, নিষ্ঠা
এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমেই কেবল একটি জাতি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ সেই ঈদকে শুধু তাৎপর্যমণ্ডিতই করেনি, বরং
তা একটি সংগ্রামী জাতির বিজয়গাথার চিরায়ত অংশ হয়ে আছে।
লেখক: সাংবাদিক,
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য
