ইতিহাস বিকৃতি ও গণমাধ্যমের দায়
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন কখনোই কেবল রাজনৈতিক ঘটনামাত্র ছিল না; বরং তা প্রায়শই ইতিহাস, স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের পুনর্ব্যাখ্যার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়ে নতুন নতুন বয়ান সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের বিস্তারের ফলে ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক, পাল্টা-বিতর্ক এবং কখনও কখনও সুস্পষ্ট অপতথ্যের প্রচার অভূতপূর্ব মাত্রা লাভ করেছে।
ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়। বরং ইতিহাসচর্চা নিজেই একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে নতুন দলিল, গবেষণা ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে অতীতকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন এবং ইতিহাস বিকৃতি এক বিষয় নয়। যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে অস্বীকার করা হয়, দলিলভিত্তিক সত্যকে উপেক্ষা করা হয় কিংবা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপতথ্য প্রচার করা হয়, তখন তা ইতিহাসচর্চা নয়; বরং ইতিহাস বিকৃতির পর্যায়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গবেষণা, দেশি-বিদেশি নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত যে ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে, তা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুজিবনগর সরকারের নথি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং বিদেশি গবেষকদের বিশ্লেষণ- সবই এ বাস্তবতাকে সমর্থন করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বা রাজনৈতিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে, কিন্তু তাঁর অস্তিত্ব বা অবদানকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা ইতিহাসের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঠিক এই প্রবণতার প্রতিফলন আজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ জনপরিসরের বিভিন্ন স্তরে দেখা যাচ্ছে। কিছু ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক কর্মী ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কিংবা উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে বিকল্প বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব বক্তব্য কখনও কখনও পর্যাপ্ত তথ্য যাচাই বা প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ছাড়াই বিভিন্ন গণমাধ্যমের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি ও মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অপতথ্য প্রচারের গতি সত্যের চেয়ে অনেক বেশি। অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলো এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয় যা উত্তেজনা, ক্ষোভ বা বিতর্ক সৃষ্টি করে। ফলে গবেষণাভিত্তিক দীর্ঘ আলোচনা অপেক্ষা উসকানিমূলক বক্তব্য, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা বিকৃত তথ্য অনেক দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এ প্রক্রিয়ায় একটি সংগঠিত গোষ্ঠী বারবার একই বক্তব্য প্রচার করলে তা ধীরে ধীরে কিছু মানুষের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হতে পারে। যোগাযোগবিদ্যায় একে "ইলিউশন অব ট্রুথ ইফেক্ট" বলা হয়, যেখানে একটি মিথ্যা বারবার শোনার ফলে তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হতে শুরু করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু উসকানিমূলক ও অশালীন রাজনৈতিক স্লোগান ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজপথে উচ্চারিত এমন স্লোগানের ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যমের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বারবার প্রচারিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে সমানভাবে অশালীন বা বিদ্বেষমূলক স্লোগানের ঘটনাগুলো অনেক সময় একই মাত্রার প্রচার বা সমালোচনার মুখোমুখি হয়নি। এর ফলে জনমনে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এই বাস্তবতায় গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
সংবাদমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশনকারী নয়; তারা জনপরিসরে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো বিতর্কিত বক্তব্য প্রকাশের আগে তা যাচাই করা, প্রাসঙ্গিক তথ্য সংযুক্ত করা এবং পাঠক-দর্শককে প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট দেওয়া।
কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমও এক ধরনের বাণিজ্যিক চাপে রয়েছে। ভিউ, ক্লিক, এনগেজমেন্ট এবং বিজ্ঞাপন আয়ের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় মিথ্যাচারকে বা বিতর্কিত বক্তব্যকে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই প্রচার করা হয়। এর ফলে সংবাদ ও প্রচারণার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
গণমাধ্যম কি কেবল দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করছে, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্য কাজ করছে? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কোনো গণমাধ্যমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন অনুচিত, তেমনি তাদের দায়িত্বহীনতার সমালোচনাও প্রয়োজন। কারণ গণমাধ্যম যদি সচেতনভাবে বা অসচেতনভাবে অপতথ্যের বাহক হয়ে ওঠে, তবে তা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আমরা একই প্রবণতা দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্যের বিস্তার, ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা কিংবা মিয়ানমারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ঘৃণামূলক প্রচারণা- সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে তথ্যযুদ্ধ আধুনিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইতিহাস বিকৃতি কেবল অতীতের প্রশ্ন নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রশ্নও। একটি জাতি তার ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। যদি নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন বা স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌলিক সত্যগুলো বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করা একটি জাতিকে তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি তৈরি করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণই একমাত্র সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসচর্চার প্রসার, গণমাধ্যমের পেশাগত নৈতিকতা শক্তিশালী করা, তথ্য যাচাই ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নাগরিকদের মিডিয়া লিটারেসি বৃদ্ধি। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক সমাজ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতিহাসের প্রশ্নে রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে দলিল, তথ্য ও গবেষণাকে সামনে আনতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জাতির উত্তরাধিকার। একইভাবে গণমাধ্যমও কোনো রাজনৈতিক পক্ষের মুখপাত্র নয়; তাদের মূল দায়িত্ব সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থ রক্ষা। তাই ঐতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে বিকৃতির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ বা বাণিজ্যিক সাফল্যের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতির ঐতিহাসিক চেতনা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং সত্যভিত্তিক জনপরিসর।ইতিহাস রক্ষার সংগ্রাম মূলত সত্য রক্ষার সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের বিকল্প নেই।
