×

মুক্তচিন্তা

কারাবন্দী সাংবাদিকদের জামিন হয় না কেন?

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম

কারাবন্দী সাংবাদিকদের জামিন হয় না কেন?

রাসেল আহমদ। ফাইল ছবি

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র নয়, তার বিচারব্যবস্থা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখনই পরিপক্বতার পরিচয় দেয়, যখন ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে। কিন্তু যদি সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেন যে আইন সবার জন্য সমান নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী তার প্রয়োগ বদলে যায়, তখন সংকট শুধু বিচারব্যবস্থার নয়- রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিরও।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে বহু মামলা প্রত্যাহার, নতুন মামলা, গ্রেপ্তার এবং জামিন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের আগে ও পরে অনেকবার বলেছে, পূর্ববর্তী সময়ের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও তথাকথিত ‘গায়েবি’ মামলার অবসান ঘটানো হবে। সেই প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিক। কারণ আইনের শাসনের প্রথম শর্তই হলো- কোনো নাগরিক যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার না হন।

কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি চিত্রও ধীরে ধীরে সামনে এসেছে। বিভিন্ন মামলায় এমন ব্যক্তিদেরও দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু এবং প্রবীণ লেখক ও মানবাধিকারকর্মী শাহরিয়ার কবির। তাঁদের প্রত্যেকেরই যেমন পছন্দের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, তাঁদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কও থাকতে পারে, তাঁদের লেখালেখি বা ভূমিকার সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা কি বিচারপূর্ব দীর্ঘ কারাবাসের ন্যায্যতা তৈরি করে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংবিধান এবং গণতন্ত্রেরও।

জামিন কোনো দয়া নয়; এটি আইনের একটি স্বীকৃত অধিকার, যা বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীনতা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি নীতি আলোচিত-"Bail is the rule, jail is the exception." অর্থাৎ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া অভিযুক্তকে অনির্দিষ্টকাল কারাগারে আটকে রাখার পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই বিচার এগিয়ে নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের সংবিধানও একই দর্শনের ভিত্তিতে নির্মিত।

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ ঘোষণা করে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। এই অনুচ্ছেদের তাৎপর্য কেবল আইনের বইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিচারব্যবস্থায় কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা পেশা বিশেষ সুবিধা বা বিশেষ বৈষম্যের কারণ হতে পারে না।

একইভাবে ৩১ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই অনুচ্ছেদের মূল দর্শন হলো- কোনো ব্যক্তিকে আইনসম্মত কারণ ছাড়া স্বাধীনতা, মর্যাদা বা জীবন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। তাই বিচারিক প্রক্রিয়া যেন প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

এই প্রেক্ষাপটে একটি বৈপরীত্য চোখে পড়ে।

একদিকে বিভিন্ন গুরুতর মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিন পাচ্ছেন। অন্যদিকে কিছু সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা জনপরিচিত ব্যক্তির জামিন বারবার বিলম্বিত হচ্ছে- এমন অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত। আদালত অবশ্যই প্রতিটি মামলার নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনা করেন। কিন্তু যখন একই সময়ে দুটি ভিন্ন চিত্র দৃশ্যমান হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়।

এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপার ঘটনায়। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালত নির্ধারণ করবেন। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে জামিনের পরও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর সংবাদ জনমনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একইভাবে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু কিংবা শাহরিয়ার কবিরের দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক নিয়েও নাগরিক সমাজের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন Committee to Protect Journalists (CPJ)-সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি নির্দোষ বা দোষী- সেই রায় দেওয়া নয়। সেই দায়িত্ব একমাত্র আদালতের। বরং প্রশ্নটি হলো, বিচারপ্রক্রিয়া কি এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে জনগণের কাছে তার নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান থাকে?

কারণ বিচার শুধু হতে হবে না; বিচার হতে দেখা-ও যেতে হবে।

রাষ্ট্রের কাছে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বিচার কি সবার জন্য একই মানদণ্ডে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি নাগরিকের পরিচয়ই তার আইনি পরিণতি নির্ধারণ করছে?

আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হলো- সমতা। সমতার অর্থ সবাইকে একই ফল দেওয়া নয়; একই আইনি মানদণ্ডে বিচার করা।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ সেই নীতিকেই আরও শক্তিশালী করেছে। এই অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য ও আইনসম্মত বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। বিচারপ্রক্রিয়া যেন শাস্তির বিকল্প না হয়ে ওঠে, সেটিই এই অনুচ্ছেদের মূল দর্শন। কারণ আদালতের রায়ের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।

এখানেই এসে সাংবাদিক শ্যামল দত্তের প্রসঙ্গ আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তিনি দোষী না নির্দোষ- সেটি আদালত নির্ধারণ করবেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক, একইভাবে শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু কিংবা শাহরিয়ার কবিরের দীর্ঘ কারাবাস— এসব ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: বিচার কি যথাসময়ে হচ্ছে, নাকি বিচারপ্রক্রিয়াই শাস্তিতে পরিণত হচ্ছে?

এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের প্রশ্ন।

কারণ আজ যদি একজন সাংবাদিক ন্যায়বিচার না পান, আগামীকাল সেই অবিচার একজন শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা সাধারণ নাগরিকের দরজায়ও কড়া নাড়তে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিহিংসার রাজনীতি নতুন নয়। এক সময় যে সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে, পরবর্তী সময়ে সেই সরকারই বিরোধী হয়ে একই অভিযোগ করেছে। এই অন্তহীন চক্র থেকে রাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতেই হবে। অন্যথায় প্রতিবার ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠবে।

গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়; আত্মবিশ্বাসে। যে রাষ্ট্র নিজের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখে, সে রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় নয়, আদালতের স্বচ্ছ বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই আত্মবিশ্বাস।

আদালতের প্রতি নাগরিকের প্রত্যাশা- সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৫ অনুচ্ছেদের চেতনাকে আরও দৃশ্যমানভাবে প্রতিফলিত করা। কারণ বিচার শুধু আইনের প্রয়োগ নয়; এটি জনগণের আস্থারও বিষয়।

আমি কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমি চাই না আমার রাজনৈতিক পরিচয় আমাকে রক্ষা করুক। আমি শুধু চাই, আমার পরিচয় যেন আমাকে বৈষম্যের শিকারও না করে।

একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের একটাই প্রত্যাশা- রাষ্ট্র যেন কাউকে নির্বাচিতভাবে আসামি না বানায়, আদালত যেন কাউকে নির্বাচিতভাবে বিচার না করে, আর আইন যেন ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের ভাষায় কথা বলে।

কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে শক্তির ওপর নয়, ন্যায়বিচারের ওপর। আর যে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের পাল্লা সমান থাকে, সেই রাষ্ট্রেই গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলেছে, পর্যায়ক্রমে খুলবে আরো কয়েকটি দেশের বাজার

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলেছে, পর্যায়ক্রমে খুলবে আরো কয়েকটি দেশের বাজার

জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় এসেছে সরকার : রিজভী

জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় এসেছে সরকার : রিজভী

গঙ্গাচড়ায় খাদ্যগুদামে ধান ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

গঙ্গাচড়ায় খাদ্যগুদামে ধান ক্রয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহত বেড়ে ১১

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে নিহত বেড়ে ১১

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App