×

মুক্তচিন্তা

ট্যাগের রাজনীতি পরিত্যাজ্য

Icon

মো. শাহাদত হোসেন

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম

ট্যাগের রাজনীতি পরিত্যাজ্য

অধ্যাপক মো. শাহাদত হোসেন

রাজনীতি ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সংকটকাল অতিক্রম করছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদেরকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলো, ক্রমেই তা ম্রিয়মান হয়ে যাচ্ছে। নতুন বাংলাদেশের আশা নিভু নিভু করছে। রাজনীতি ও সমাজ কোন ক্ষেত্রেই প্রত্যাশার আলো দেখা যাচ্ছে না।

বিশেষত রাজনীতিতে ট্যাগিং সংস্কৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একে এখন নিংসন্দেহে রাজনীতির মহামারি বলে আখ্যায়িত করা যায়। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা হয়েছিল ট্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে। শেখ হাসিনা যখন ছাত্রদেরকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে ট্যাগ দেন, তখনই ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকর’ স্লোগানে সারা বাংলা প্রকম্পিত হয়ে ওঠেছিলো। 

মূলত একজন মানুষ যা নয়, তাকে সেই শব্দে মার্কিং করাই হলো ট্যাগ দেয়া। ইংরেজি Tag শব্দের সাধারণ বাংলা অর্থ হলো চিহ্নিত করা, লেভেল লাগানো। রাজনীতিতে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অপমানসূচক শব্দ বা বাক্য দ্বারা চিহ্নিত করাকেই ট্যাগিং বলা হয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় রাজাকার, শিবির, ফ্যাসিবাদী, গুপ্ত, শাহবাগী, পাকিবীজ, ভারতীয় দালাল, মৌলবাদ, জঙ্গি, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, কাফের, বট প্রভৃতি শব্দ ট্যাগিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বা হচ্ছে। 

শেখ হাসিনা তাঁর ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য বিরোধী দলকে নির্মূল করা জরুরি মনে করতেন। কিন্তু স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় শক্তি দ্বারা বিরোধী দলকে দমন করা সম্ভব হলেও নির্মূল করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি বেছে নেন। বিরোধী বিএনপি ও জামায়াত ইসলামকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তিনি দলগুলোর নেতা-কর্মীদেরকে গণহারে রাজকার ট্যাগ দিতে থাকেন। ট্যাগিংয়ের রাজনীতি শুরু করতে গণজাগরণ মঞ্চও তাঁকে সহায়তা করে।  

শেখ হাসিনার এই কৌশল সফল হয়। তাঁর এই ট্যাগিং দেয়ার প্রবণতা দ্রুতই তাঁর কর্মীরা গ্রহণ করে। শুধু তাই নয়, রাজাকার, জামায়াত-শিবির ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে বিরোধী নেতা-কর্মীকে খুন করা তাদের কাছে বৈধ হয়ে যায়। পুলিশের উপস্থিতিতেই বিরোধী দলের নেতাকর্মী বা বিরোধী মতের মানুষকে রাজাকার-শিবির ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। এসব নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। প্রধানমন্ত্রীর প্ররোচনায় অনুপাণিত হয়ে পুলিশও এদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতো। 

বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকাণ্ডের কথা আমাদের সকলের মনে থাকার কথা। ট্যাগিং রাজনীতির বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড। শিবিরি ট্যাগ দিয়ে রাজধানীতে পুলিশ ও জনতার উপস্থিতিতে তাকে হত্যা করা হয়। 

দিনটি ছিল ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর। সকাল ৯টা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সরকারবিরোধী অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। পুরান ঢাকার জজকোর্ট থেকে আইনজীবীরা অবরোধের সমর্থনে একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি নজরুল সরকারি কলেজের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আইনজীবীদের ওপর হামলা চালায়। আক্রান্ত আইনজীবীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। 

আলোচ্য বিশ্বজিৎ দাস, যার বাবার নাম অনন্ত দাস ও মায়ের নাম কল্পনা রানী ঘোষ, ধর্ম-হিন্দু (সনাতনী), বয়স-২৫, পেশা দর্জি। কাজের উদ্দেশ্যে বড় ভাইয়ের দোকান নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্সে যাওয়ার পথে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। সন্ত্রাসীরা তাকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে নির্বিচারে মারতে থাকে। এলাপাথারি কিলঘুষি দেয়, বারংবার লোহা শলাকা দিয়ে আঘাত করে। ‘শিবির’ হত্যার অনাবিল আনন্দে নৃত্যের তালে তালে বিশ্বজিৎকে খুন করতে থাকে। ‘শিবির’ ট্যাগ দেয়ায় নিকটস্থ পুলিশ বা জনতা তাকে বাঁচাতে আসেনি। 

বিশ্বজিৎ বার বার চিৎকার করে বলছিল, আমি শিবির নই, আমি হিন্দু। তবু সন্ত্রাসীরা তার কথা বিশ্বাস করেনি, বিশ্বাস করার প্রয়োজন মনে করেনি। 

শেখ হাসিনার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে ট্যাগ দিয়ে গুম, খুন, নির্যাতন এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। সৃষ্টি করা হয় আয়নাঘর। ছাত্রলীগ ছাড়াও পুলিশ-র‌্যাবও ট্যাগ দিয়ে মানুষ হত্যাকে বৈধতা দেয়, কখনো কখনো নিজেরা হত্যা করে। সমাজ ও রাষ্ট্র এটিকে সাধারণ ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। 

বুয়েটের আবরার ফাহাদ রাব্বির কথা মনে আছে? তিনি ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ১০১১ রুমে থাকতেন। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় ‘শিবির’ সন্দেহে বুয়েট ছাত্রলীগর নেতাকর্মীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে। 

এছাড়াও ‘রাজাকার’ ট্যাগ দিয়ে শুধু নির্যাতন নয়, জুডিশিয়াল কিলিং পর্যন্ত হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ‘রাজাকার’ ট্যাগ দিয়ে নিজের মসনদই কাঁপিয়ে তুলে শেখ হাসিনা। সারা দেশের মানুষ ক্ষেভে ফেটে পড়ে, স্লোগান তুলে, তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈারাচার। অর্থাৎ বহুদিন ধরে ট্যাগ দিয়ে মানুষকে নির্যাতন করতে করতে মধ্য জুলাইয়ে তা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। 

মজার ব্যাপার হলো ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রায় এগারো হাজার রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগে সবচেয়ে বেশি রাজাকার রয়েছে। দলের অনুসারীরা আওয়ামী রাজাকারদের ভক্তিশ্রদ্ধা করলেও বিরোধীদের রাজাকার ট্যাগ দিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতো। 

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকেও রাজাকার ট্যাগ দিতে দ্বিধা করেনি। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাবও বাতিল করে দেয়।  

কিন্তু ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের পর মানুষ এই ট্যাগিংয়ের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্ন দেখেছিলো। বাস্তবে তা হলো না। বরং নতুন করে ‘ফ্যাসিবাদ’ ট্যাগিং শুরু হলো। যারাই আওয়ামী লীগ, যুব লীগ বা ছাত্রলীগের সমর্থক ছিলো তাদেরকে ফ্যাসিস্ট ট্যাগ দেয়া শুরু হলো। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় ‘ফ্যাসিবাদী’ ট্যাগিং যেন পালে হাওয়া পেলো। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। আমরা মনে করি যারা ফ্যাসিবাদের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল না তাদেরকে এমন ট্যাগ দেয়া অন্যায়। অবশ্য ধীরে ধীরে এই প্রবণতা কমে আসছে। 

তবে নতুন করে ‘গুপ্ত’ ট্যাগিংয়ের রাজনীতি বেশ জোড়ালোভাবে শুরু হয়েছে। অধুনা দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রতিপক্ষ কয়েকটি দলের নেতাকর্মীদের ‘গুপ্ত’ ট্যাগ দেয়া হয়েছে। আর সাধারণ নিয়মেই তা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে এই ট্যাগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে।  

কিন্তু বিরোধী পক্ষও শক্তিশালী হওয়ায় তারাও পাল্টা তাদের প্রতিপক্ষকে একই ট্যাগ দিচ্ছে। মূলত বর্তমান সরকারি দল এবং বিরোধী দল প্রত্যেক দলের নেতাকর্মীই বিগত সতের বছরের কোন না কোন সময় গুপ্ত থাকতে বাধ্য হয়েছে, পালিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে, পরিচয় গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছে। ফলে তাদের এই ট্যাগিং বুমেরাং হয়ে নিজেদের দিকেই ফিরে আসছে। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পারবর্তী রাজনীতির এই ট্যাগিং একদিকে যেমন আশঙ্কার, অন্যদিকে সমাজে হাস্যরসেরও সৃষ্টি করেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমার স্ত্রীকেও সন্দেহ হয় সে গুপ্ত রাজনীতি করে কিনা। তার মানে গুপ্ত শুধু রাজনীতিতে নয়, পরিবারেও ছড়িয়ে পড়েছে। 

যাই হোক, সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে আমাদেরকে সব ধরনের ট্যাগিং থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ট্যাগিংয়ের রাজনীতির ফলে সমাজে মানুষের মধ্যে বিভেদ বাড়ছে, অশান্তি বাড়ছে, সন্দেহ বাড়ছে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ট্যাগিং এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে একে এখন সমাজের ক্যান্সার হিসেবে অখ্যায়িত করা যায়। 

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই ট্যাগিং থেকে বের হয়ে সমাজে সহনশীলতা সৃষ্টি করা। প্রতিটি দলের উচিত তাদের কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। রাজনৈতিক দলের বুদ্ধিজীবীদের উচিত একটি মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা। প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষ নয়, বরং যৌক্তিক আলোচনা-সমালোচনায় উৎসাহিত করা। শুধু ক্ষমতা নয়, জনতার জন্য রাজনীতি করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনীতি সঠিক পথে চললে সামাজও সঠিক পথে চলতে বাধ্য।

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ। 

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বিশ্বকাপ ফাইনালের এক টিকিটের দাম কত

বিশ্বকাপ ফাইনালের এক টিকিটের দাম কত

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে

রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পর্যায়ে

দেশে ১০টি আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী দেশে ১০টি আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে

গণপরিবহন আধুনিকায়নে ১৪০০ বৈদ্যুতিক বাস আনছে সরকার

গণপরিবহন আধুনিকায়নে ১৪০০ বৈদ্যুতিক বাস আনছে সরকার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App