শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করতে পারে
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম
রাসেল আহমদ। ফাইল ছবি
শেখ হাসিনা যদি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরেন, সেটি নিছক একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে প্রত্যাবর্তন হবে না। এটি একই সঙ্গে বাংলাদেশের আইন, রাজনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। কারণ শেখ হাসিনা এখন শুধু দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা একজন সাবেক সরকারপ্রধান নন; তিনি বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারার প্রতীক। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক সংঘাত, তাঁর সরকারের ভূমিকা এবং পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ারও তিনি অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। ফলে তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি ‘তিনি ফিরবেন কি ফিরবেন না’-এই সরল সমীকরণে সীমাবদ্ধ রাখলে এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। বড় প্রশ্ন হলো, তিনি ফিরলে বাংলাদেশ সেই প্রত্যাবর্তনকে কীভাবে সামলাবে এবং তা রাষ্ট্রের জন্য কী অর্থ বহন করবে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা মানেই যে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন -এমন ধারণা অতিসরলীকরণ হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ উত্তরাধিকার আছে, আওয়ামী লীগের একটি বিস্তৃত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আবার ২০২৪ সালের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও আমূল বদলে গেছে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ আর ২০২৪ সালের আগের বাংলাদেশ নয়। ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি ঘটবে -এমন নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি তাঁর প্রত্যাবর্তনকে গুরুত্বহীন করে দেখারও সুযোগ নেই। বরং এটি আওয়ামী লীগসহ দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হবে বিচার। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরছেন, অথচ তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও বিচারিক রায় রয়েছে -এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় পরীক্ষা। এখানে রাষ্ট্রের সামনে দুটি বিপজ্জনক চরমপন্থা রয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া; অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযোগ ও বিচারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা। দুটিই আইনের শাসনের জন্য ক্ষতিকর। শেখ হাসিনা অপরাধ করেছেন কি না, করলে তাঁর কী শাস্তি প্রাপ্য -তার চূড়ান্ত উত্তর রাজনৈতিক মঞ্চে নয়, আদালতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডসম্মত। কারণ শেখ হাসিনার বিচার শেষ পর্যন্ত শুধু একজন ব্যক্তির বিচার হিসেবে বিবেচিত হবে না; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও পরীক্ষা হবে।
এই জায়গায় ২০২৪ সালের ঘটনাবলির ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তিরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকতে হবে। রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনার মামলাও রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে। আর যদি বিচারপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে প্রতিভাত হয়, তাহলে রায় যত কঠোরই হোক, তার নৈতিক ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চাইছে, আর ভারত বিষয়টি আইনি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করছে। দিল্লির জন্য শেখ হাসিনা কেবল বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ভারতের দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক অংশীদার এবং একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। ফলে নয়াদিল্লি তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নিজেদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের হিসাব করেই। বাংলাদেশেরও উচিত একইভাবে বিষয়টিকে আবেগের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দৃষ্টিতে দেখা।
এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন পরিণত কূটনীতি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌম ও আইনি অধিকার; কিন্তু সেই দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তৈরি করা কোনো বিচক্ষণ রাষ্ট্রনীতির পরিচয় হবে না। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। একটি ব্যক্তিকে ঘিরে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে জিম্মি করা তাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকার অবস্থান হওয়া উচিত দৃঢ়, কিন্তু উত্তেজনাহীন; নীতিগত, কিন্তু বাস্তববাদী।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি হতে পারে। তাঁর সমর্থকেরা এটিকে রাজনৈতিক পুনরাগমনের সূচনা হিসেবে দেখতে পারেন; বিরোধীরা সেটিকে ২০২৪ সালের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পাল্টা স্রোত হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। এই আবেগ যদি রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতার ক্ষত আবারও উন্মুক্ত হতে পারে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে কাউকে বিশেষ সুবিধা না দেওয়া, আবার কাউকে জনরোষের হাতে ছেড়ে না দেওয়া। রাজনৈতিক বিরোধিতার উত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এবং অপরাধের উত্তর আইনের মাধ্যমে দিতে হবে।
এখানে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন দলটির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, আবার নতুন সংকটও তৈরি করতে পারে। একটি রাজনৈতিক দল শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। আওয়ামী লীগের সামনে যদি ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ আসে, তাহলে তাকে অতীতের ভুল, বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস, সংগঠনের গণতান্ত্রিকীকরণ এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া শুধু একজন নেতার প্রত্যাবর্তন দলটিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে পারবে না।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়ার ধারণাও গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং আইন মেনে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির সহাবস্থান নিশ্চিত করার মধ্যে। তবে সেই অংশগ্রহণের শর্তও স্পষ্ট হতে হবে—সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা আইনের শাসনের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক শক্তির ছাড় থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রকৃত অর্থ নির্ভর করবে বাংলাদেশ সেই ঘটনাকে কীভাবে পরিচালনা করে তার ওপর। রাষ্ট্র যদি এটিকে প্রতিশোধের সুযোগ হিসেবে নেয়, তাহলে বিভাজন আরও গভীর হবে। আর যদি এটিকে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক সহাবস্থান ও পরিণত কূটনীতির পরীক্ষায় পরিণত করতে পারে, তাহলে একটি কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায় থেকেই নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সূচনা হতে পারে।
একজন নেতার দেশে ফেরা ইতিহাসের একটি ঘটনা। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্র কী করে- সেটিই ইতিহাসের বড় প্রশ্ন। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন তাই কেবল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি অধ্যায় নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিণতবোধেরও পরীক্ষা। বাংলাদেশ কি অতীতের ক্ষতকে প্রতিশোধের মাধ্যমে আরও গভীর করবে, নাকি ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করবে- শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্থ শেষ পর্যন্ত সেখানেই নিহিত।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
