ফ্যাসিবাদের ধারণা ও বাকশালের রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৩ পিএম
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে ‘ফ্যাসিবাদ’ এখন এমন এক শব্দ, এর ব্যবহার যত বেড়েছে, তার ঐতিহাসিক অর্থ যেন ততই ক্ষীণ হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে শব্দটি এমন অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে যে মুসোলিনি, হিটলার, নাৎসিবাদ, বর্ণবাদ, সংগঠিত রাজনৈতিক সহিংসতা ও জাতীয় পুনর্জন্মের যে ভয়াবহ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ‘ফ্যাসিবাদ’ ধারণাটির জন্ম, সেটিই আড়ালে পড়ছে। শেখ মুজিবুর রহমানকে ফ্যাসিস্ট বলা হচ্ছে, বাকশালকে বলা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। প্রশ্ন হলো, এই অভিধা কি ইতিহাসের পরীক্ষায় টেকে?
ফ্যাসিবাদ কোনো সাধারণ গালি নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা ও রাজনৈতিক আচরণের ধারণা। তাই কোনো রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদ, একদলীয়তা, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন দেখা গেলেই তাকে ফ্যাসিবাদ বলা যায় না। এসব বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, রাজতন্ত্র, একদলীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং নানা ধরনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায়ও দেখা গেছে। ফ্যাসিবাদকে আলাদা করে চেনার জন্য দেখতে হয় তার জাতীয়তাবাদ, গণসংগঠন, শত্রু নির্মাণ, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রকল্পকে।
রজার গ্রিফিন ফ্যাসিবাদের কেন্দ্রে ‘palingenetic ultranationalism’ -অর্থাৎ জাতীয় পুনর্জন্মের মিথের সঙ্গে যুক্ত চরম জাতীয়তাবাদ -কে গুরুত্ব দিয়েছেন। রবার্ট প্যাক্সটনও ফ্যাসিবাদকে শুধু লিখিত মতাদর্শ হিসেবে দেখেননি; তিনি এর মধ্যে জাতীয় অবক্ষয়ের বোধ, ঐক্য ও শুদ্ধতার আবেগ, সংগঠিত জাতীয়তাবাদী গণশক্তি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মতো উপাদান চিহ্নিত করেছেন।
মুসোলিনির ইতালি ও হিটলারের জার্মানিতে এই বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল বক্তৃতায় ছিল না; সেগুলো রাজনৈতিক সংগঠন ও রাষ্ট্রক্ষমতার বাস্তব আচরণে পরিণত হয়েছিল। স্কোয়াড্রিস্তি ও এসএ-এর মতো সংগঠিত বাহিনী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত। উর্দি, মিছিল, সামরিক শৃঙ্খলা, নেতার প্রতি আনুগত্য এবং সহিংসতাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করে তোলা ছিল সেই রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। জাতিকে একটি অবিভাজ্য জৈবিক বা ঐতিহাসিক সত্তা হিসেবে কল্পনা করে তার ‘শুদ্ধতা’ রক্ষার নামে ভেতরের শত্রু চিহ্নিত করাও ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই মানদণ্ড সামনে রাখলে শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে সরাসরি ফ্যাসিবাদের ঘরে তুলে রাখা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্কতা গড়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলন, বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ছয় দফার কেন্দ্রে ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ও দেখায়, মুজিবের রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস ছিল জনগণের ভোট।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূখণ্ড -বর্ণগত বিশুদ্ধতা নয়। এটি ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের ভিত্তিতে কোনো ‘শুদ্ধ জাতি’ নির্মাণের তত্ত্ব ছিল না। জাতির ভেতরের কোনো সম্প্রদায়কে জৈবিকভাবে বহিষ্কার কিংবা নির্মূল করার কোনো আদর্শিক প্রকল্পও তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষিত জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের মৌলিক আদর্শিক পার্থক্য এখানেই।
কিন্তু এখানেই একটি সতর্কতা জরুরি। শেখ মুজিবের শাসনামলকে সমালোচনা থেকে মুক্ত করার কোনো কারণ নেই। বরং ১৯৭৫ সালের বাকশাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন ও বিতর্কিত অধ্যায়। একদলীয় কাঠামো, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকোচন, রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ সীমিত করার সিদ্ধান্ত -এসবের কঠোর সমালোচনা অবশ্যই করা যায়। এগুলোকে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বলা যায়। কিন্তু কর্তৃত্ববাদ এবং ফ্যাসিবাদকে এক করে ফেললে সমালোচনাই দুর্বল হয়ে যায়।
কারণ বাকশালকে ফ্যাসিবাদ বলতে হলে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। কোথায় ছিল বর্জনমূলক জাতিগত পুরাণ? কোথায় ছিল আধাসামরিক দলীয় বাহিনী, যার প্রধান কাজ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সহিংসভাবে নিশ্চিহ্ন করা? কোথায় ছিল জাতীয় পুনর্জন্মের নামে সমাজকে ‘শুদ্ধ’ করার সহিংস প্রকল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু একদলীয়তা বা সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণকে ফ্যাসিবাদের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা তাত্ত্বিকভাবে যথেষ্ট নয়।
বাকশালকে বোঝার ক্ষেত্রে তার সমাজতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটও উপেক্ষা করা যায় না। একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বহু সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বের নানা রাষ্ট্রেও জাতীয় মুক্তির পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নামে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এসব ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক ঘাটতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা হতে পারে; কিন্তু প্রতিটি একদলীয় ব্যবস্থাকে ফ্যাসিবাদ বললে রাজনৈতিক ইতিহাসের শ্রেণিবিন্যাসই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাকশালের পটভূমিও তাই দেখতে হবে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বিপর্যস্ত একটি রাষ্ট্র। আইনশৃঙ্খলার সংকট, রাজনৈতিক সংঘাত, সশস্ত্র তৎপরতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতা তখন বাস্তবতা। এসব পরিস্থিতি বাকশালকে ন্যায্য প্রমাণ করে না; কিন্তু কেন মুজিব সরকার বহুদলীয় সংসদীয় কাঠামো থেকে সরে গিয়েছিল, তার ব্যাখ্যায় এগুলোকে বাদ দেওয়াও ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।
এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হয় যখন শেখ মুজিবের প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনকে ১৯৭৫ সালের কয়েক মাস দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়। পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দীর্ঘ কারাবাস, নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব -এসবকে বাদ দিয়ে শুধু বাকশাল দিয়ে মুজিবকে ব্যাখ্যা করা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি বাকশালের রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে আড়াল করাও সমান ভুল।
শেখ মুজিবের ১৯৭৫-এর শাসনামলের সমালোচনার জন্য ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটির কোনো প্রয়োজন নেই। বরং ‘কর্তৃত্ববাদী’, ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ’, ‘ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন’ কিংবা ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকোচন’ -এসব শব্দ অনেক বেশি নির্দিষ্ট, প্রমাণযোগ্য এবং বিশ্লেষণী শক্তিসম্পন্ন। ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী শব্দটি ব্যবহার করলেই যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় না; বরং সঠিক শব্দ নির্বাচনই যুক্তির শক্তি বাড়ায়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিধায় চিহ্নিত করা সহজ। কঠিন কাজ হলো একই মানদণ্ড নিজের পছন্দ-অপছন্দের বাইরে প্রয়োগ করা। আজ যদি বাকশালকে ফ্যাসিবাদ বলা হয়, তবে সেই সংজ্ঞার আলোকে বিশ্বের অন্যান্য একদলীয় সমাজতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের অবস্থানও ব্যাখ্যা করতে হবে। মানদণ্ড যদি ব্যক্তি ও পক্ষভেদে বদলে যায়, তবে সেটি ইতিহাসচর্চা নয়; সেটি রাজনৈতিক প্রচারণা।
শেখ মুজিবকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই, ফ্যাসিস্ট বানানোরও নয়। তাঁকে ইতিহাসের একজন জটিল, শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই বিচার করতে হবে। তাঁর সাফল্য যেমন থাকবে, তেমনি ব্যর্থতাও থাকবে; তাঁর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস যেমন থাকবে, তেমনি বাকশালের কর্তৃত্ববাদী মোড়ও থাকবে। ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার মানে কাউকে নির্দোষ প্রমাণ করা নয় -বরং তাঁকে যে ছিলেন, তার চেয়ে বেশি বা কম কিছু না বানানো।
ফ্যাসিবাদ শব্দটির প্রকৃত শক্তি এখানেই রক্ষা করতে হবে। কারণ শব্দটি যখন সব অপছন্দের শাসকের জন্য ব্যবহার করা হবে, তখন সত্যিকারের ফ্যাসিবাদকে শনাক্ত করার সময় শব্দটির আর কোনো বিশ্লেষণী ধার থাকবে না। ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্লোগানে নামিয়ে আনা সহজ; ইতিহাসের জটিলতাকে তার যথাযথ জায়গায় রেখে বিচার করা কঠিন। কিন্তু সেই কঠিন কাজটিই একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
