টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলে যেসব ক্ষতি হয়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দৈনন্দিন জীবনে টুথপেস্ট এমন একটি পণ্য, যা প্রায় সবাই প্রতিদিন ব্যবহার করে। দাঁত পরিষ্কার ও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এটি অপরিহার্য। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যবহৃত ৩৪টি টুথপেস্টের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬টিতে (৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ) মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে। এই তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
যদিও বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশ টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র দানা (Microbeads) ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, তবুও কিছু নিম্নমানের বা অনিয়ন্ত্রিত পণ্যে এ ধরনের উপাদান থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই সচেতন থাকা জরুরি।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণা। এগুলো দুই ধরনের হতে পারে প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট আকারে তৈরি করা হয়, যেমন কিছু পুরোনো প্রসাধনী বা স্ক্রাবিং পণ্যে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের দানা। সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক: বড় প্লাস্টিক ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হলে তা সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন: যে ৮ টুথপেস্টে পাওয়া যায়নি কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক
এসব কণা বাতাস, পানি, খাদ্য এবং এমনকি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত এবং প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিকে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটুকু?
বর্তমানে এমন কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, যা সরাসরি বলে যে টুথপেস্টে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক ক্যানসার সৃষ্টি করে।
তবে গবেষকরা মনে করেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ (Inflammation), অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেমন বিসফেনল-এ (BPA) বা ফ্যাথালেটস (Phthalates)-এর মতো উপাদান নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে টুথপেস্টের মাধ্যমে এসব রাসায়নিকের কতটা শরীরে প্রবেশ করে এবং তা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় কি না এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমিয়ে আনা বুদ্ধিমানের কাজ।
মাইক্রোপ্লাস্টিকে কী ক্ষতি হতে পারে?
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে চলমান গবেষণায় কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
১. শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
২. কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
৩. হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে প্লাস্টিকে থাকা কিছু রাসায়নিকের কারণে।
৪. রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৫. অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে।
৬. দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, প্রজনন সমস্যা বা বিপাকীয় জটিলতার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য তৈরি হয়নি। তাই নিশ্চিত দাবি করার পরিবর্তে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন গবেষকেরা।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন?
প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে মনে করা হয়।
এর কারণ হলো— শিশুদের শরীর এখনো বেড়ে ওঠার পর্যায়ে থাকে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। দাঁত ব্রাশ করার সময় অনেক শিশু টুথপেস্ট গিলে ফেলে। শরীরের ওজন কম হওয়ায় একই পরিমাণ পদার্থ তাদের শরীরে তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
আরও পড়ুন: বাজারে ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
এ কারণে শিশুদের জন্য এমন টুথপেস্ট ব্যবহার করা উচিত, যেখানে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক বা ক্ষতিকর উপাদান নেই। পাশাপাশি ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট গিলে না ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক নিরাপদ?
বর্তমানে মানুষের শরীরে ঠিক কতটুকু মাইক্রোপ্লাস্টিক নিরাপদ এমন কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ বিষয়ে গবেষণা এখনো চলমান। তাই যতটা সম্ভব মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে যেসব পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিকের কণা ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
কী করবেন?
নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—
১. পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট ব্যবহার করুন।
২. পণ্যের উপাদান (Ingredients) পড়ে নিন।
৩. Polyethylene (PE), Polypropylene (PP), Polyethylene Terephthalate (PET), Nylon বা Acrylates Copolymer-এর মতো প্লাস্টিকজাত উপাদান থাকলে সতর্ক থাকুন।
৪. শিশুদের ব্রাশ করার সময় অভিভাবকের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করুন।
৫. টুথপেস্ট কখনো গিলে ফেলবেন না। সরকারি অনুমোদিত ও মানসম্মত পণ্য ব্যবহার করুন।
৬. পরিবেশবান্ধব এবং মাইক্রোবিড-মুক্ত (Microbead-free) পণ্য বেছে নিন।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
দন্ত চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিকের পুঁতি ব্যবহার করা হয় না। কারণ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উপাদান নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয়েছে।
তবে বাজারে থাকা সব পণ্যের মান সমান নয়। তাই অপরিচিত বা নিম্নমানের প্রসাধনী ও টুথপেস্ট ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন: ইউনিলিভারের ৮ টুথপেস্টে মিলেছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য দিনে অন্তত দুইবার ফ্লোরাইডযুক্ত মানসম্মত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা উচিত। শুধুমাত্র মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়ে দাঁত ব্রাশ বন্ধ করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
টুথপেস্ট কি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর?
যদি টুথপেস্টে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র দানা থাকে, তাহলে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ব্রাশ করার পর এসব কণা ড্রেন দিয়ে নদী-সমুদ্রে পৌঁছে যায়। অধিকাংশ বর্জ্য পরিশোধনাগার এত ছোট প্লাস্টিক কণা সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করতে পারে না। ফলে মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে এগুলো ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে আবার মানুষের শরীরেও ফিরে আসতে পারে। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে মাইক্রোবিড ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কোলগেট টুথপেস্টে কি প্লাস্টিকের পুঁতি থাকে?
বর্তমানে Colgate-Palmolive জানিয়েছে যে তাদের অধিকাংশ বাজারজাত টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিকের মাইক্রোবিড ব্যবহার করা হয় না। অতীতে কিছু নির্দিষ্ট পণ্যে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র দানা ব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর আগে সেগুলো ব্যবহার বন্ধ করেছে।
তবে বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত পণ্যের উপাদান ভিন্ন হতে পারে। তাই যে কোনো টুথপেস্ট কেনার আগে এর Ingredients তালিকা দেখে নেওয়া ভালো।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উদ্বেগের অন্যতম বিষয়। যদিও টুথপেস্টে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, তবুও অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমিয়ে আনা স্বাস্থ্যসম্মত সিদ্ধান্ত।
বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট ব্যবহার, উপাদান সম্পর্কে সচেতনতা এবং শিশুদের সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশের অভ্যাস গড়ে তোলা এসব পদক্ষেপ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
