×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ (সা.)

Icon

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ (সা.)

বারোই রবিউল আউয়ালে প্রিয় নবীর আগমন

যেই নবীজির শুভাগমনে ধন্য হলো ত্রিভুবন।

বস্তুত যেই মহামানবের শুভাগমনে সত্যিকার অর্থে এই ধূলির ধরা ধন্য হয়েছে তিনি হলেন ত্রিভুবনের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। বিশ্ব ইতিহাসের এক প্রতিশ্রæত মহামানব তিনি, যাঁর শুভাগমনের প্রতীক্ষায় ছিল গোটা বিশ্বলোক। জন্মের বহু পূর্ব থেকেই সমগ্র জ্ঞান-জগৎ তাঁরই মর্ত্যলোকে প্রেরিত হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছিল। পবিত্র কুরআনে এসেছে ‘ওয়া মুবাশশিরাম বিরাসুলিন ইয়াতি মিমবাদি ইসমুহু আহমাদ’। অর্থাৎ হজরত মারইয়াম তনয় ঈসা (আ.) বলেন, আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসুল আসবেন আমি হচ্ছি তাঁর সুসংবাদদাতা (৬১:৬)। এভাবে তদানীন্তন দুনিয়ায় সব ধর্ম-দর্শনে, আকিদা-বিশ্বাসে আর ধর্মীয় গ্রন্থাবলিতে সেই মহাপুরুষের আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়েছে। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর নিশ্চয়ই তিনি মুহাম্মদ (সা.); যাঁর বর্ণনা পূর্ববর্তীদের গ্রন্থগুলোয় রয়েছে (২৬:১৯৬)। ইহুদিদের তাওরাত, খ্রিস্টানদের বাইবেল, বৌদ্ধদের ত্রিপিটক, হিন্দুদের বেদ-পুরাণ ও পারসিকদের জিন্দাবেস্তায় প্রতিশ্রæত বিশ্বমানব মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। আর তিনি নিজে স্বীয় সত্তা সম্বন্ধে বলেছেন, ‘আমি পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া (২:১২৮), পয়গম্বর ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ (৬১:৬) এবং আমার মা আমেনার স্বপ্নের ফসল।’ রাসুল-জননী আমেনার স্বপ্নটি এমন ছিল যে, একটি আলোক-প্রভা তাঁর শরীর থেকে নির্গত হয়ে শ্যাম দেশের প্রাসাদগুলোকে উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে; সেই আলোকের নামই মুহাম্মদ (সা.)। মায়ের এই স্বপ্নটি ছিল তাঁর কীর্তিময় সন্তানের শুভাগমনের পূর্বাভাস; সময়ের ব্যবধানে যিনি হলেন এই মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব।

মানুষ মানুষের কাছে বা গোটা সৃষ্টিলোকের প্রিয়পাত্র হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজনীয়তা আবশ্যক। নৈতিক ও মানবিক সব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের ধারক হলেই কেবল একজন মানুষ ত্রিভুবনের প্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে মানবজীবনে যা অত্যাবশ্যক সেটি হলো আখলাক তথা উন্নত চরিত্র। সেদিক থেকে মহানবী (সা.) ছিলেন ব্যতিক্রমী, স্বতন্ত্র ও অনন্য; কেননা একজন পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিচ্ছবি তাঁর মাঝে প্রতিফলিত হয়েছিল। পৃথিবীর মানুষ তাঁর উন্নত চারিত্রিক মাধুর্য নিয়ে আর কী-ই বা বলবে; স্বয়ং মহান আল্লাহই তাঁর চরিত্রের সনদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওয়া ইন্নাকা লাআলা খুলুকিন আযিম’ অর্থাৎ হে রাসুল আপনি সর্বোন্নত মহান চরিত্রের উপরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন (৬৮:৪)। তাঁর জীবনের সব দিক-বিভাগ মানুষ ও মানবতার জন্য শিক্ষণীয় এবং আশীর্বাদ হিসেবে পরিগণিত। নবী-জীবনের কোনো বিষয়ই লুকানো বা অপ্রকাশিত নেই; আদর্শ হিসেবে সব কিছুই বলে দেয়া বা প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। তাঁর নির্দেশনা ছিল দিবসে বা রজনিতে আমার মাঝে তোমরা যা কিছুই প্রত্যক্ষ করবে, সবকিছুই মানুষের কাছে বর্ণনা করে দেবে। এমন কোনো কথা তিনি বলেননি যেটি নিজে পালন করতেন না বা এমন কোনো কাজ তিনি করেননি, যাতে মানুষের জন্য কল্যাণ ও আদর্শের বিষয় থাকত না। তাঁর কথা, কাজ ও সম্মতি সবই ছিল মানুষের জন্য অনুকরণীয়। আর সে কারণেই পৃথিবীর স্রষ্টার অমোঘ ঘোষণা ‘ওয়ামা আতাকুমুর রাসুলু ফাখুযুহু ওয়ামা নাহাকুম আনহু ফান্তাহু’ অর্থাৎ তোমাদের রাসুল, যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা তোমরা পালন করো আর যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন তা থেকে নিজেদের বিরত রাখ (৫৯:৭), কেবলমাত্র আদর্শিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় যিনি সর্বোন্নত মর্যাদায় নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, তাঁরই সব আদেশ-নিষেধ বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া যায়; সে ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) অতুলনীয়।

মানবসমাজে মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন ও সমাদৃত হওয়ার আরেকটি প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞা; যার মাধ্যমে মানুষ অন্যদের ওপরে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তারে সক্ষমতা লাভ করে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আনা মাদিনাতুল এল্ম’ অর্থাৎ আমি হচ্ছি জ্ঞানের রাজ্য। অন্য একটি ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘ইন্নামা বুইসতু মোআল্লিমান’ অর্থাৎ নিশ্চিতরূপে আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। বিস্ময়কর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন মহানবী (সা.); যে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মহান আল্লাহ শুধু তাঁকেই বিশেষভাবে প্রদান করেছিলেন। আনুষ্ঠানিক জ্ঞানার্জন না করেও তিনি সর্বাপেক্ষা অধিক জ্ঞানী, এখানেই তাঁর বিশেষ মাহাত্ম্য ও স্বাতন্ত্র্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ওয়াকুর রাব্বি যিদনি ইলমা’ অর্থাৎ বলো, হে প্রভু আমার জ্ঞানকে বৃদ্ধি করে দাও (২০:১১৪)। মহানবী (সা.) সরাসরি মহান আল্লাহর কাছ থেকে জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছেন এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অনেক অজানা শাখায়ও তাঁর বিচরণ ছিল; যার মাধ্যমে তিনি নিজের জ্ঞান-জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘ওয়া আল্লামাকা মা লাম তাকুন তাঅলাম’ অর্থাৎ মহান আল্লাহ তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন এমন জ্ঞান, যা তুমি জানতে না (৪:১১৩)। পরম করুণাময় প্রভু মহানবীকে (সা.) সব জ্ঞান মুখস্থ করিয়ে দিতেন, তা তিনি বক্ষে ধারণ করতেন এবং পাঠের সক্ষমতা লাভ করতেন। বিবৃত জ্ঞানের কোনো কিছু তাঁর কাছে দুর্বোধ্য মনে হলে মহান আল্লাহই তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন (৭৫:১৭)। পবিত্র কুরআনে সব জ্ঞানের মজুত রয়েছে ‘মা ফার্রাতনা ফিল কিতাবি মিন শাইয়িন’ অর্থাৎ জ্ঞানের কোনো বিষয়ই কুরআনে লিখতে আমি ছাড়িনি (৬:৩৮)। আর সেই কুরআনি জ্ঞানের ধারক হলেন মহানবী (সা.); তাই জ্ঞান-প্রজ্ঞার কোনো অংশই তাঁর কাছে অনুপস্থিত ছিল না।

মানবসমাজে প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য মানুষের সৌন্দর্য এক নিয়ামক শক্তি। মহানবী (সা.) সেখানেও শতভাগ উত্তীর্ণ ছিলেন। দৈহিক সৌন্দর্যের দিক থেকে তিনি ছিলেন সবার সেরা; তাঁর মতো সুন্দর দেখতে কখনো কেউ ছিল না আর হবেও না। মহানবী (সা.) বলতেন, ‘আল্লাহু জামিলুন য়ুহিব্বুল জামাল’ অর্থাৎ আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। আর রাসুল (সা.) হলেন সৌন্দর্যের সম্রাট; সে জন্য তিনি হলেন ‘হাবিবুল্লাহ’ তথা আল্লাহর সর্বাপেক্ষা প্রিয় বন্ধু এবং সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। নবীপতœী হজরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘যে সব সুন্দরী হজরত ইউসুফ (আ.)-কে দেখে নিজেদের অজান্তে তাদের হাত কেটে ফেলেছিল, তারা যদি মহানবী (সা.)-কে দেখতে পেত, তবে কখন যে হাত কাটতে কাটতে নিজেদের অজান্তে তারা তাদের কলিজাও কেটে ফেলে দিত তা মোটেই টের পেত না।’ লালিমা মিশ্রিত উজ্জ¦ল বর্ণের ছিলেন মহানবী (সা.)। পূর্ণিমা রাতের মতো ঝলমল করতে দেখা যেত তাঁর চেহারা মোবারক, কোঁকড়ানো মসৃণ চুল, উন্নত ললাট, প্রশস্ত বক্ষ, খাড়া নাসিকা, সরু ভ্রæ, বিস্তৃত মুখমণ্ডল, সম্মোহনী দৃষ্টিদ্বয়, জাদুময়ী চাহনী, দৃষ্টিনন্দন কাঁধ, বৃহদাকার মাথা, প্রশস্ত তালু ও বাহুবিশিষ্ট হস্তদ্বয়, সমান উচ্চতার বুক-পেট, মুক্তার দানার মতো ঝলমলে দাঁত, মেদহীন শরীর, মাংসল ও লম্বা আঙুল, মসৃণ কদমযুগল, উন্নত গর্দান আর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব-প্রভার আলোকে উদ্ভাসিত সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ছিলেন মহানবী (সা.); যে কেউই তাঁর সামনে যেত, বিস্মিত হতো তাঁকে দেখে, যতবার দেখত মনে হতো এই প্রথমবার দেখেছে। তাঁর মাঝে বিরাজিত ভাব-গাম্ভীর্য আর অপার সৌন্দর্য দেখে সবাই বলত, এমন সুন্দর মানুষ আর কখনো দেখিনি। তাইতো মহানবী (সা.) হলেন ত্রিভুবনের সবার প্রিয়, সবচেয়ে প্রিয়।

লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি, বারোই রবিউল আউয়ালে বিশ্বনবীর আগমন, যেই নবীজির শুভাগমনে ধন্য হলো ত্রিভুবন। সারা জাহান মাতোয়ারা যেই ফুলেরই খুশবুতে, তিনিই হলেন প্রিয় রাসুল সৃষ্টি-সুখের উল্লাস তাতে! কুল কায়েনাত তথা গোটা সৃষ্টি-জগতের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ প্রেরিত মহাপুরুষ, বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানবতার অকৃত্রিম কাণ্ডারি, মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ধরাপৃষ্ঠে শুভাগমনের মাস শুরু হয়ে গেছে; বরকতমণ্ডিত রবিউল আউয়াল মাস চলছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ তথা সব সৃষ্টিলোকের জন্যই তিনি ছিলেন ত্রাণকর্তা, সংস্কারক ও অনুসরণীয় আদর্শ; এ মাসের অত্যধিক গুরুত্বের মূল কারণই হলো তাঁর সেই ঐতিহাসিক শুভাগমন। জগৎটা ছিল তখন পূতি-দুর্গন্ধময়, অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বর্বরতার সর্বশেষ ধাপে উপনীত; মানবতার সব দ্বার ছিল রুদ্ধ, একবারেই তালাবদ্ধ এবং সর্বত্রই ছিল জুলুমের রাজত্ব। জোর যার মুল্লুক তার- এ নীতিই ছিল সবখানে প্রযোজ্য, আশরাফুল মাখলুকাত অভিধা সংবলিত মানুষগুলোর দেহ ছিল, প্রাণ ছিল, কিন্তু তাতে সত্যিকারের মানুষ ও মানবতার পরিপূরক উপাদানগুলোর কোনো বালাই ছিল না। অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা ও অসভ্যতার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজের সর্বত্র; এবং সেই দুর্গন্ধই হয়ে পড়েছিল তদানীন্তন বিশ্বের ক্ষমতা-বলয়ের সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর পথচলার অবশ্যম্ভাবী উপকরণ। মানবতা, সুস্থ রুচিবোধ, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল; সর্বত্রই বিরাজমান ছিল কুসংস্কার আর নির্লজ্জতার হাতছানি। পৃথিবী সেই পূতি-দুর্গন্ধময়তার অবসান ঘটাতে একটি খুশবুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিল। যেই ফুলের সৌরভে-খুশবুতে বিপদগ্রস্ত পৃথিবী তখন বহুল প্রতীক্ষিত আনন্দে-উল্লাসে মাতোয়ারা হয়েছিল সেই ফুলের নাম ‘মুহাম্মদ (সা.)’।

কবি বলেছেন, জুটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জুটে তবে অর্ধেকে ফুল কিনে নিও হে অনুরাগী! ফুলের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য এমনই। বাগানের ফুল একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে তার সুবাস ছড়ায়, মানুষ তার সুগন্ধী নেয়, পুলক অনুভব করে। কিন্তু এ ফুলের সৌরভ খুবই ক্ষণস্থায়ী, ফুল ছিঁড়ে নিলে তা কিছু সময় পরেই বিবর্ণ হতে থাকে, সুগন্ধীও তিরোহিত হয়ে যায়। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে বিশ্ববাগে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক ফুলের সংযোজন ঘটেছিল, যার সৌরভ আজো সর্বত্র সমানভাবে প্রবহমান। সেই ফুলের ক্ষয় নেই, লয় নেই, স্বাদ-গন্ধেরও কোনো কমতির বিষয় নেই, সৌরভেরও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই; সেই ফুলের খুশবুতে পৃথিবীর প্রলয় অবধি মাতোয়ারা থাকবে সমুদয় সৃষ্টি। সেই ফুলের খুশবু বিতরণের নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডি নেই, দেশ নেই, স্থান-কাল-পাত্র নেই; সমগ্র বিশ্বটাই তার সুগন্ধীর তরে পাগলপারা, মন্ত্রমুগ্ধ। সেই ফুলের স্বর্গীয় খুশবুতে যেমনিভাবে জেহালতের যুগের সব পূতি-দুর্গন্ধময়তা তিরোহিত হয়েছিল, আজকের আধুনিক বিশ্বেও তা সমভাবে প্রযোজ্য; জাত-ধর্মের বিচারও এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কেননা জগৎসমূহের মহান প্রতিপালক সমগ্র সৃষ্টির জন্যই তাঁকে নির্বাচিত ও প্রেরণ করেছেন। মহান প্রভু বলেন, ‘কুল য়া আইয়ুহান্নাস ইন্নি রাসুলুল্লাহি ইলাইকুম জামিআ’ অর্থাৎ হে রাসুল! আপনি বলে দিন ওহে মানব সব! আমি তোমাদের সবার জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। সে কারণেই সেই ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বময়। যে বা যারাই নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশের নানা অঙ্গনে জড়িয়ে থাকা দুর্গন্ধময়তার অবসান ঘটাতে চায়, তাদের জন্যই মুহাম্মদী ফুলের সৌরভ; এ সৌরভের অতুলনীয় ঘ্রাণেই যে কেউ তার পরিমণ্ডলকে সাজাতে ও বিন্যস্ত করতে পারে নতুন আঙ্গিকে, নবচেতনায়।

হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। রবিউল আউয়াল মানে হলো প্রথম বসন্ত। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেমন সজীবতা লাভ করে তেমনি এ মাসে মানবকুল শিরোমণি মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে জরাগ্রস্ত পৃথিবী তার প্রাণ ফিরে পায়; তাঁরই স্বর্গীয় খুশবুতে বিশ্ব-প্রকৃতি নির্মলতা ও সজীবতার উপাদান লাভ করে। মহানবীর (সা.) ঘোষণা অনুযায়ী এ মাসের প্রথম দিন যদি কেউ রোজা পালন করে তবে মহান আল্লাহ তাকে পূর্ণ বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব দান করবেন। কেননা এটি সেই মাস, যা বিশ্ব ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের স্মারক বহন করে চলেছে; মানবতার মহান সুহৃদ রাসুলে পাক (সা.) এ মাসেই ধরাপৃষ্ঠে যেমন আগমন করেন, এ মাসেই হিজরতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সূত্রপাত হয় এবং পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট যুগকে সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের রূপায়ণ ঘটিয়ে এ মাসেই প্রিয় নবীজি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। উম্মুল মুমেনিন খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর শুভ পরিণয় এবং মসজিদে কুবা নির্মাণের ঐতিহাসিকতাও জড়িয়ে আছে এ পবিত্র মাসের সঙ্গে। তাই বরকতের এ মাস যেমন আনন্দের ঠিক তেমনি বেদনার; হিজরতের তাৎপর্যের দিক থেকেও এ মাস গুরুত্বপূর্ণ। অন্ধকার জগৎকে আলোকিত করেছে এই মাস, তাই রবিউল আউয়ালে আমাদের অনুভূতির জগৎ যেমন পুলকিত তেমনি শোকাভিভূত।

আল কুরআনুল কারিমের সুরা রহমানে মহান আল্লাহ সুগন্ধী ফুলের কথা উল্লেখ করেছেন। মুসলিম শরিফের হাদিসে রয়েছে, রাসুলে পাক (সা.) ফুলের তাৎপর্য ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন, ‘কাউকে যদি ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বা সম্মাননা জানানো হয় তবে সে যেন তা প্রত্যাখ্যান না করে; কেননা ফুল বহনে হালকা এবং তার ঘ্রাণ খুবই উত্তম।’ তবে নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে বৃক্ষ-তরুর সুগন্ধী ফুলের চেয়ে জীবনাদর্শের অনুসরণীয় প্রিয় রাসুল নামের স্বর্গীয় খুশবুমাখা ফুলের আবেদনই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ; যে ফুলকে ভালোবাসলে মহান স্রষ্টার ভালোবাসা অর্জিত হয়, জীবনের সব পাপাচারের অবসান ঘটে এবং প্রত্যাশিত মুক্তি ও নাজাতের পথ প্রসারিত হয়। রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম দশকে আমাদের অঙ্গীকার, মানবতা ও সভ্যতার মুক্তি ও সর্বাঙ্গীণ সফলতার জন্য মহান প্রভুর পক্ষ থেকে আবির্ভূত যেই ফুলের খুশবুতে ভুবন আজ মাতোয়ারা, আমরা তাঁরই অনুপম আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকেও সেই খুশবুর প্রবহমান ধারায় ধন্য করব।

এ পর্যায়ে আমরা প্রিয় নবীর সঙ্গে মহান স্রষ্টার ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন নিয়ে আলোচনা করব। এ আলোচনায় অন্যান্য নবী-রাসুলগণের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর মর্যাদাগত পার্থক্যটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠবে। আল্লাহর ঘোষণা ‘তিলকার রুসুলু ফাদ্দালনা বাদাহুম আলা বাদিন’ অর্থাৎ রাসুলগণ এমন যে, আমরা তাঁদের কাউকে কারো ওপর মর্যাদা দান করেছি (২:২৫৩)। আর এই মর্যাদা প্রদানের ফল-প্রাপ্তিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার লাভ করেছেন মহানবী (সা.)। পরম স্রষ্টা সব নবী ও রাসুলকে প্রয়োজনবোধে নাম ধরে ডেকেছেন, কিন্তু মহানবী (সা.) সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম; পবিত্র কুরআনের সুরা ফাতিহা হতে শুরু করে সুরা নাস পর্যন্ত কোথাও আল্লাহপাক তাঁর প্রিয় হাবিবকে নাম ধরে ডাকেননি। পবিত্র কুরআনে ইয়া আদাম, ইয়া মুসা, ইয়া ইব্রাহিম, ইয়া জাকারিয়্যা এভাবে অন্যান্য নবী-রাসুলকে সম্বোধন করলেও মুহাম্মদ (সা.)-কে বলেছেন, ইয়া আইয়ুহান নাবিয়্যু, ইয়া আইয়্যুহাল মুয্যাম্মিল, ইয়া আইয়্যুহাল মুদ্দাস্সির প্রভৃতি বলে সম্বোধন করেছেন। তবে কি পবিত্র কুরআনে কোথাও তিনি ‘মুহাম্মদ’ বলেননি? নিশ্চয়ই বলেছেন, আর তা কেবল মহানবীর শান-শওকত ও অবস্থান সম্বন্ধে বিবরণের ক্ষেত্রেই ‘মুহাম্মদ’ শব্দটির প্রয়োগ ঘটেছে। যেমন- ‘ওয়ামা মোহাম্মাদুন ইল্লা রাসুল’ (৩:১৪৪), ‘মা কানা মোহাম্মাদুন আবা আহাদিম র্মিরিজালিকুম’ (৩৩:৪০), ‘ওয়া আমানু বিমা নুয্যিলা আলা মোহাম্মাদিন’ (৪৭:২), ‘মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহি’ (৪৮:২৯) ইত্যাদি। একজন নবী, রাসুল এবং মানুষ হিসেবে মহান স্রষ্টা তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ (সা)-কে কতটুকু গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রদান করেছেন তা এখানে পরিষ্কার হয়েছে।

তিন ভুবনের সমাহারকে ত্রিভুবন বলা হয়ে থাকে। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের সমন্বয়ে যে রূপ তাকেই অনেকে ত্রিভুবন অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায় এখানে মূলত ইহজগৎ ও পরজগৎকেই বোঝানো হয়েছে। অন্য কথায়, এখানে ত্রিভুবন বলতে সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে গোটা সৃষ্টিজগৎ তথা মহাবিশ্বকেই তুলে ধরা হয়েছে; যার সর্বকালের সবচেয়ে প্রিয়পাত্র হলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)। সমগ্র মহাবিশ্বের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও প্রিয় সেই মহামানবের ধরাপৃষ্ঠে শুভাগমনের ফলশ্রæতিতে তাই কবি আকাশ, সাগর, বাতাস তথা কুল মাখলুককে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরই দর্শনে নিজেদের ধন্য ও আপ্লুত করতে। কবির ভাষায়-

ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়।

আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।

ধূলির ধরা বেহেশতে আজ, জয় করিল দিল রে লাজ।

আজকে খুশির ঢল নেমেছে ধূসর সাহারায়।

দেখ আমিনা মায়ের কোলে, দোলে শিশু ইসলাম দোলে।

কচি মুখে শাহাদাতের বাণী সে শোনায়।

আজকে যত পাপী ও তাপী, সব গুনাহের পেল মাফী।

দুনিয়া হতে বে-ইনসাফি জুলুম নিল বিদায়।

নিখিল দরুদ পড়ে লয়ে নাম, সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।

জিন পরী ফেরেশতা সালাম জানায় নবীর পায়।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন : সাবেক চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মৃত বন্ধুকে জীবিত বলে অপহরণ নাটক, ধরা খেলেন চার বন্ধু

মৃত বন্ধুকে জীবিত বলে অপহরণ নাটক, ধরা খেলেন চার বন্ধু

মানুষ যেন এনবিআরকে ভয় নয়, বিশ্বাস করে: প্রধানমন্ত্রী

মানুষ যেন এনবিআরকে ভয় নয়, বিশ্বাস করে: প্রধানমন্ত্রী

‘কমিশনারের ভাগনে’ পরিচয় দিয়ে হাইওয়ে থানার সামনে গুলি, ভিডিও ভাইরাল

‘কমিশনারের ভাগনে’ পরিচয় দিয়ে হাইওয়ে থানার সামনে গুলি, ভিডিও ভাইরাল

২০০ বৈদ্যুতিক বাস কিনছে সরকার, নারীদের জন্য ১০০টি

২০০ বৈদ্যুতিক বাস কিনছে সরকার, নারীদের জন্য ১০০টি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App