পড়াশোনায় মেয়েরা এগিয়ে, চাকরিতে পিছিয়ে
ঝর্ণা মনি
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: প্রতীকী
- তিন কারণে বিসিএসে পিছিয়ে নারীরা
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় ছেলেদের তুলনায় মেয়ে পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা বরাবরই বেশি। এই দুই পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-ফাইভসহ পাশের হারেও এগিয়ে তারা। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মেয়েদের পাসের হার ৮৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ; আর ছেলেদের পাসের হার ৮১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। শুধু পাসের হারে নয়, জিপিও-৫ এর ক্ষেত্রেও ছেলেদের তুলনায় ১৫ হাজার ৪২৩ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
দেশের উচ্চশিক্ষায় ছাত্র ও ছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় সমান। একাডেমিক বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলেও এগিয়ে ছাত্রীরাই। কিন্তু দেশের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির পরীক্ষায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে তারা। ৩৮তম থেকে ৪৩তম বিসিএসের ফলাফল বিশ্লেষণে এ তথ্য দেখা গেছে। এই ৬ বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত নারীদের হার কমেছে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। নন-ক্যাডারে কমেছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা ওঠে যাওয়ার পর থেকে এ সমস্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছেই। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসির) সবশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য ওঠে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা শেষে ছাত্রীদের চাকরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। এক্ষেত্রে বিয়ে ও সংসারের চাপ সামলানো, কোটা যুগের অবসান, মানবিকের পরীক্ষার্থী বেশি- প্রধানত. তিনটি কারণকেই চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পিএসসির তথ্যমতে, আগে পাঁচ বিসিএসে নারীদের নিয়োগের হার ছিল এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ২৫-২৬ শতাংশের ঘরে। গত ছয়টি বিসিএসে তা ক্রমেই কমছে। ৬টি সাধারণ বিসিএসের গড় হিসেবে প্রতি ১০০ ক্যাডার পদের ৭৫টিতেই নিয়োগ পেয়েছেন পুরুষরা। নারীদের ক্যাডার পদে নিয়োগের হার মাত্র ২৫ শতাংশ। ৪৩তম বিসিএসে তা নেমেছে ২০ শতাংশেরও নিচে। ৪৩তম বিসিএসে মোট উত্তীর্ণ ২ হাজার ১৬৩ জন। এর মধ্যে নারীর হার ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ৪১তম বিসিএসে নারীর প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে ৬৭২ জন। যা মোট সুপারিশ প্রাপ্তের ২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। ৪০তম বিসিএসে এ হার ২৬ দশমিক ০৩ শতাংশ ছিল। অন্যদিকে ৪৩তম বিসিএসে ১ম শ্রেণির চাকরির নন-ক্যাডারে পুরুষ সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ১১৬ জন। কিন্তু নারী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাত্র ৯ জন। অর্থাৎ পুরুষদের তুলনায় ১০ শতাংশেরও কম চাকরি পেয়েছেন নারীরা।
একই বিসিএসে দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মোট সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ৫১৭ জন। এরমধ্যে নারী মাত্র ১০৩ জন। অর্থাৎ ২১ দশমিক ০৪ শতাংশ। একই অবস্থা অন্য বিসিএসেও। ৪১তম বিসিএসে প্রথম শ্রেণিতে সুপারিশ প্রাপ্ত ৯৩৯ জনের মধ্যে নারী ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২য় শ্রেণিতে নারী সুপারিশ পেয়েছে ৫১৭ জন। যা মোট সুপারিশ প্রাপ্তের ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। ৪০তম বিসিএসে ১ম শ্রেণিতে কিছুটা ভালো থাকলেও ২য় শ্রেণির চাকরিতে এই হার আরো কমেছে। এ বিসিএসে ১ম শ্রেণিতে নারীর হার ছিল ২৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে এ হার ২০ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
উচ্চশিক্ষায় এগিয়েছে নারীরা : বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ও ছাত্রীর পার্থক্য কমে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক পরীক্ষায়ও ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে ছাত্রীরা। এমনকি বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায়ও ছাত্রীদের ফলাফল ভালো। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৬৩টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায় ও তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার। এর মধ্যে ছাত্র ২৫ লাখ ৪২ হাজার এবং ছাত্রী ২২ লাখ ১৪ হাজার। এ হিসেবে মোট শিক্ষার্থীর ৪৮ শতাংশ ছাত্রী এবং ৫২ শতাংশ ছাত্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার ভোরের কাগজকে বলেন, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। নারী শিক্ষার্থীদের ফলাফলও ভালো। দশ বছর আগে ২০১৩-১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের ভর্তির হার ছিল ৪৫ শতাংশ। বর্তমানে এই হার ৫১ শতাংশ। এদের মধ্যে অধিকাংশ মফস্বলের। প্রথম বর্ষে হলে আমরা সবার আবাসন নিশ্চিত করতে পারি না। যারা হলে সিট পায়, তাদের বেশির ভাগকেই গণরুমে থাকতে হয়। অন্যদিকে অনেকেই মেসে থাকে। সবার আর্থিক সঙ্গতি সমান থাকে না। ফলে অনেকেরই পড়াশোনা, থাকা-খাওয়ার সমন্বয় করতে পাশাপাশি পার্টটাইম জব, টিউশনি করতে হয়। এতে কেউ কেউ ডিপ্রেশনে চলে যায়। অত্যন্ত মেধাবী সত্ত্বেও প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার আগেই তারা মানসিকভাবে হেরে যায়। স্টেমিনা হারিয়ে ফেলে। তখন অনেকেই বিসিএসের দিকে আর ঝুঁকে না।
কোটা যুগের অবসানে পিছিয়ে নারীরা : সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয় ১৯৭২ সালে। ওইসময় ৮০ শতাংশ কোটা ছিল। পরে বেশ কয়েকবার এই কোটা ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সবশেষ কোটা ছিল ৫৫ শতাংশ। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, জেলাভিত্তিক কোটা ১০ শতাংশ, নারীর জন্য ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা ছিল। পরে ১ শতাংশ কোটা প্রতিবন্ধীদের জন্যও নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই সরকার আরেকটি প্রজ্ঞাপনে জানায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে (৯ম থেকে ১৩তম) নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে কোনো কোটা বহাল নেই। ৩৮তম বিসিএসের পর কোটা পদ্ধতি ওঠে যায়। কোটার সবশেষ ওই বিসিএসে নারী ক্যাডার হয়েছেন ৫৯৩, যা মোট উত্তীর্ণের ২৬ দশমিক ৯১ শতাংশ; যা ছয়টি বিসিএস পরে নারীর হার কমেছে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
সমাজে নারী-পুরুষ সমতা আনয়নে কোটা ব্যবস্থার পুনরায় বহাল চেয়েছেন অনেকেই। তাদের মতে, সরকার নারীর ক্ষমতায়নে জোর দিচ্ছে। পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশসহ বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ পাচ্ছেন নারীরা। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিয়ে ও সংসারের চাপ সামলে শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারছেন না অনেকেই। ফলে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে নারীরা পিছিয়ে রয়েছে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা এখনো পুরুষদের মতো সাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেনি। সেজন্য আরো কিছু সময় নারীদের জন্য কোটা রাখা প্রয়োজন ছিল। কোটা বৈষম্য হলেও নারী ও উপজাতি কোটা রাখা প্রয়োজন। অন্তত ৫ শতাংশ হলেও রাখা দরকার। যখন আমরা দেখবো, চাকরিতে নারীরা ৩০ শতাংশের উপরে পৌঁছাতে পেরেছে। তখন কোটা বাদ দেয়া যেতে পারে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের মেয়েরা অনেক মেধাবী এটি সত্যি। এসএসসি, এইচএসসিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেয়েরাই এগিয়ে রয়েছে। রেজাল্টও তারা ভালো করছে। কিন্তু বিসিএস কমপ্লিকেটেট পরীক্ষা। এজন্য যে পরিমাণ এফোর্ট দিতে হয়, তা সব মেয়ের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ অনেকেরই অনার্স পড়ার সময় বিয়ে যায়। বাচ্চা-সংসার সামলে বিসিএস আর হয়ে ওঠে না। তিনি বলেন, সবদিক বিবেচনা করেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু নারীদের জন্য কোটা বরাদ্ধ রেখেছিলেন। পিরামিডের চূড়া পর্যন্ত সমান লেভেলে পৌঁছাতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিসিএসে কোটা থাকা প্রয়োজন।
পরীক্ষার্থী বেশি মানবিকের, সুপারিশ বেশি বিজ্ঞানের : বিসিএসে মানবিক বিভাগ থেকে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও চাকরির জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশ বেশি পাচ্ছেন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। পিএসসির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৪১তম ও ৪৩তম বিসিএসে মানবিক বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। তবে পিএসসি যাদের চাকরির জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করেছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ৪১তম বিসিএসে সুপারিশ করা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। ৪৩তম বিসিএসে সেটি ছিল ৩৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। অবশ্য পিএসসির প্রতিবেদনে প্রকৌশল ও চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আলাদা বিভাগ দেখানো হয়েছে। এই দুটি বিভাগকে বিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে যোগ করলে দেখা যায়, ওই দুই বিসিএসে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়াদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের বেশি ছিল বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী।
বিশেষ বিসিএসে নারী-পুরুষ সমান সমান : সাধারণ বিসিএসে নারী ক্যাডার কম হলেও বিশেষ বিসিএসে নারী-পুরুষ হার প্রায় সমান সমান। পিএসসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে মোট ৬ হাজার ৭৯২ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৯২ জন নারী, বাকি ৩ হাজার ৬০০ জন পুরুষ। শতাংশের হিসাবে ৪৭ শতাংশ নারী এবং ৫৩ শতাংশ পুরুষ। ৪২তম বিশেষ বিসিএসে ৪ হাজার ক্যাডার নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে নারী এক হাজার ৯৬১ জন এবং পুরুষ ২ হাজার ৩৯ জন। ৪৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশই নারী এবং ৫০ দশমিক ৯৮ শতাংশ পুরুষ।
নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, বললেন মন্ত্রী : বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগে নারীরা পিছিয়ে নয়; বরং এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। মঙ্গলবার (২৮ মে) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে ‘বিএসআরএফ সংলাপ’ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি বিসিএসে ২৬-২৭ শতাংশ নারী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। সেটি কিন্তু তারা ধরে রেখেছেন’ সেখানে কোনো ব্যত্যয় নেই।
মন্ত্রী বলেন, ৩৫তম বিসিএসে নারী কর্মকর্তা রয়েছেন ২৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ৩৬তম বিসিএসে আমরা দেখেছি নারী কর্মকর্তা ২৬ দশমিক ২২ শতাংশ। ৩৭তম বিসিএসে দেখেছি ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ৩৮তম বিসিএসে ২৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। ৪০তম বিসিএসে দেখেছি নারীদের হার ২৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। সবশেষ ৪১তম বিসিএসে ২৬ দশমিক ৭১ শতাংশ নারী প্রার্থী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন পদায়নের জন্য। তিনি বলেন, ১০ শতাংশ নারী কোটা বাতিলের পরও নারীরা আগের মতোই নিয়োগ পাচ্ছেন। এখানে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ৪০তম বিসিএস থেকেই নারীদের কোনো কোটা নেই। ক্যাডার সার্ভিস ছাড়াও সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিতে ২৯ শতাংশ নারী রয়েছেন বলে জানান জনপ্রশাসন মন্ত্রী।
