রামপুরায় হত্যা
হাবিবুরসহ তিন জন পেলেন মৃত্যুদণ্ড
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করা এবং দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে গ্রেপ্তার থাকা একমাত্র আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে এজলাসে তোলা হয়। মামলার অপর চার আসামি পলাতক রয়েছেন।
বেলা ১১টা ৪৮ মিনিট থেকে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন। প্রথমেই রায়ের কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের জন্য অনুমতি চান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর অনুমতি সাপেক্ষে এ কার্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি দেখানো হয়।
শুরুতেই এ মামলার আসামিদের দায় পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা। এরপর চার্জ পড়েন বিচারক মোহিতুল হক এনাম। আর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে চালানো পুলিশের গুলি থেকে প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন আমির হোসেন। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়। একপর্যায়ে ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকা আমিরের ওপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন দুই পুলিশ সদস্য। এতে জীবন বাঁচলেও গুরুতর আহত হন তিনি। একই দিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে দুজন নিহত হন।
রায়ে সংক্ষুব্ধ সাজাপ্রাপ্ত চঞ্চলের আইনজীবী
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন।
আইনজীবী নিপ্পন বলেন, চঞ্চল চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে একটি এক্সট্রা-জুডিসিয়াল কনফেশন এসেছে। আমরা বারবার ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছি, বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। অতএব আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ কারণেই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে যাব।
তিনি বলেন, আমার ক্লায়েন্টের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। ১৯ জুলাই তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন সেন্টারে দায়িত্বে ছিলেন। সিডিআর-এ সেটি উল্লেখ রয়েছে। হঠাৎ একটি ভিডিওর ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। যা সমীচীন হয়নি বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ কারণেই আপিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ন্যায়বিচার পেলেন শহীদ-আহত পরিবারের সদস্যরা :
রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ন্যায়বিচার পেলেন শহীদ-আহত পরিবারের সদস্যরা।
রবিবার ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি তৃতীয় রায়। এ ঘটনায় দুজন শহীদ ও একজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছর ও এসআই তরিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
আমিনুল ইসলাম বলেন, একটি বেতার বার্তার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকানোর জন্য ছাত্র-জনতার পায়ে গুলি করতে অধীনদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান। তার মৌখিক নির্দেশনা এমন থাকলেও বাস্তবে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলি চালিয়ে এভাবে হত্যাকাণ্ড চালান মামলার আসামিরা। এতে প্রাণ হারান মায়া ইসলাম ও নাহিদ ইসলাম। এছাড়া কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে নির্বিচারে গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেছিলেন চঞ্চল চন্দ্র সরকার। স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়। এজন্য তিনটি অভিযোগের একটিতে তাকে সাজা দেয়া হয়। বাকি দুটিতে খালাস পান তিনি।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এটি একটি যথার্থ রায় হয়েছে। আমরা এ রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করছি। একইসঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।
