উজানের ঢলে ফুঁসছে তিস্তা, বন্যার আশঙ্কা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আবারো ফুঁসে উঠেছে তিস্তাসহ তিনটি নদীর পানি। তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। প্রবাহিত হচ্ছে ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। এছাড়া কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপৎসীমা ৪ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানির চাপ সামাল দিতে ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়া হয়েছে। এতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে নদীগুলোর তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের ফসলি জমি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর নীলফামারী এলাকার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ধরা হয় ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার; যা অতিক্রম করে ৫২ দশমিক ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে জানান তিনি।
মঙ্গলবার বেলা ৩টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল; যা সন্ধ্যায় নেমে যায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে বলা হয়, কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট), মারকুলি (সুনামগঞ্জ) এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
ভুটান ও সিকিম পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির চাপে তিস্তা নদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দো-মহনী ও মেখলিগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশে ধেয়ে আসায় উভয় দেশের তিস্তায় লাল সতর্কতা জারির খবর পাওয়া গেছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তারা সতর্কতার মধ্যে রয়েছেন। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইচগেট খুলে রাখা হয়েছে। নদীর আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সমস্ত পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রেখেছে প্রশাসন।
এদিকে তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সুনামগঞ্জের মারকুলি, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও নেত্রকোনার কলমাকান্দা এলাকার নিম্নাঞ্চলেও পানি ঢুকে পড়েছে।
পাউবো জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে সবশেষ ২৩ জুন প্রথমবারের মতো তিস্তার পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপরে উঠেছিল, যা পরদিনই নেমে যায়। তবে রবিবার দুপুর থেকে পুনরায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট এবং ফসলি জমি তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বহু পরিবার পানিবন্দি হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। পানি আরো বাড়লে বসতবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক ও বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।
নদী তীরবর্তী হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দূর্না গ্রামের রহিমুদ্দিন বলেন, হঠাৎ পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে পানি ওঠায় গবাদিপশু ও শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা।
পানির চাপ বাড়ায় তিস্তার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও নদী তীরবর্তী উঁচু রাস্তাগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে পাউবো বাঁধ সংস্কারের টেকসই কাজ না করে বর্ষা এলে জরুরি মেরামতের নামে সরকারি অর্থ অপচয় করে। ফলে প্রতি বছরই তাদের ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকতে হয়।
এদিকে গত দুই সপ্তাহে কয়েক দফা বন্যার কারণে কৃষকরা আগেই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নতুন করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজি, বাদাম, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের আরো ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ শুরু করছে।
ডিমলা টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম সাহিন বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
পানির চাপ বেড়ে গেলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদীর তীরবর্তী এলাকার উঁচু রাস্তাগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। দীর্ঘ দিন ধরে সংস্কার না করা এসব বাঁধ চলতি বন্যায় বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করছেন লালমনিরহাটের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব নিয়ে কাজ না করে ফেলে রাখে। বর্ষা এলে এসবে জরুরি মেরামত দেখি সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করে। অথচ শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ মেরামত করলে কাজগুলো যেমন পাকাপোক্ত হবে। তেমনি নদীভাঙন আর বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পেত। আজিজ আহমেদ নামে একজন অভিযোগ করে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কাজ করলে ফাঁকি দিতে পারবেন না। আর বর্ষায় কাজ করলে কাজ না করেও বলতে পারবে কাজ করেছি, তা পানিতে ভেসে গেছে। এ সব কারণে নদীর স্থায়ী কোনো কাজ হয় না। বর্ষা এলে সিসি ব্লক আর বালুর বস্তা নিয়ে দৌড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন। বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন পাউবো কর্মকর্তারা।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, ভারতের উজানের কয়েকটি প্রদেশে অনবরত ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে আগামী ২৪ ঘণ্টা তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে অথবা এর আশপাশে অবস্থান করতে পারে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
