অন্ধত্বের বড় কারণ এখনো ছানি, অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় ১০ লাখ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে অন্ধত্বের সবচেয়ে বড় কারণ এখনো ছানি। দেশে দ্বিপক্ষীয় (উভয় চোখের) অন্ধত্বের প্রায় ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশের জন্য দায়ী ছানি, যেখানে বিশ্বব্যাপী এ হার ৫১ শতাংশ। প্রতি বছর নতুন করে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি অন্ধত্ব-সৃষ্টিকারী ছানি রোগী যুক্ত হচ্ছে, আর বর্তমানে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। প্রয়োজনের তুলনায় দেশে চক্ষু সার্জনের সংখ্যাও প্রায় ৪ গুণ কম।
গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাপী পালিত ‘ছানি সচেতনতা মাস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যাটার্যাক্ট অ্যান্ড রিফ্র্যাকটিভ সার্জনস (বিএসসিআরএস)। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে আয়োজিত এই সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবির। স্বাগত বক্তব্য দেন ছানি সচেতনতা মাস উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম. নজরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের সার্বিক সমন্বয় করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ. এস. এম. মইন উদ্দিন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডা. মইন উদ্দিন জানান, দেশে বর্তমানে ছানি অস্ত্রোপচারের ব্যাকলগ প্রায় ১০ লাখ। প্রতি ৮৩৩ জন অপেক্ষমাণ রোগীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন যোগ্য সার্জন। দেশে চক্ষু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ২০০ জন, যা আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৪ গুণ কম।
তিনি আরো জানান, দেশে আনুমানিক ৪০ হাজার অন্ধ শিশুর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশু চিকিৎসাযোগ্য হলেও এখনো শৈশবকালীন ছানির অস্ত্রোপচার পায়নি। একজন সার্জনের ওপর যদি এক হাজারের কাছাকাছি রোগীর দায়িত্ব পড়ে, তাহলে জমে থাকা রোগীর চাপ কমানো সম্ভব নয়। প্রতিরোধযোগ্য এই অন্ধত্ব নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।
ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ছানি এখনো বাংলাদেশে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীই সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে পারেন। তাই ছানি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত চক্ষুসেবা স¤প্রসারণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বে অন্ধত্বের প্রায় ৫১ শতাংশের কারণ ছানি হলেও বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৮০ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চিকিৎসানির্ভর থাকায় রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণে ঘাটতি রয়েছে। সরকার এখন চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা জোরদার করা হবে, যাতে চোখের রোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায়।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ছানি অস্ত্রোপচার অত্যন্ত নিরাপদ, কার্যকর এবং দ্রুত আরোগ্য নিশ্চিত করছে। তাই দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেলে ভয়, কুসংস্কার বা অবহেলা না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।
বক্তারা ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, ঝাপসা দেখা বা ছানির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। তাদের ভাষায়, ‘দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেলে অবহেলা নয়- চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সময়মতো ছানি অপারেশনই অন্ধত্ব প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’
অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, শিক্ষক, রেসিডেন্ট চিকিৎসক, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএসসিআরএস জানায়, ছানি সচেতনতা মাস উপলক্ষে জুনজুড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা, গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি, বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভা, চোখ পরীক্ষা ক্যাম্প এবং জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব কমাতে জাতীয় প্রচেষ্টা আরো জোরদার করাই তাদের লক্ষ্য।
