এক রাতে জোড়া অঘটন
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
এটাই সেই রাত, যেদিন বিশ্বকাপের নকআউট ফুটবল আবারো মনে করিয়ে দিল- নাম, ইতিহাস, র্যাঙ্কিং কিংবা বলের দখল নয়, শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় স্নায়ু, শৃঙ্খলা আর সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা। ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর এক নাটকীয় রাতে বিদায় নিল ইউরোপের দুই পরাশক্তি জার্মানি আর নেদারল্যান্ডস। নতুন ইতিহাস লিখে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল দক্ষিণ আমেরিকার প্যারাগুয়ে ও আফ্রিকার মরক্কো।
দুটি ম্যাচের মিল ছিল অবিশ্বাস্য। দুই খেলাই ১২০ মিনিট শেষে শেষ হয় ১-১ সমতায়। এরপর নিষ্পত্তি টাইব্রেকারে। আর সেখানেই ভেঙে পড়ে দুই ইউরোপীয় জায়ান্টের স্বপ্ন। জার্মানি হারল প্যারাগুয়ের কাছে, নেদারল্যান্ডস হারল মরক্কোর কাছে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে মানসিক চাপের পরীক্ষায় ব্যর্থ হলো দুই ঐতিহ্যবাহী শক্তি; অন্যদিকে ঠাণ্ডা মাথা, অসাধারণ গোলকিপিং ও অদম্য মানসিক দৃঢ়তায় ইতিহাস গড়ল প্যারাগুয়ে ও মরক্কো।
বোস্টনের ম্যাচে শুরু থেকেই আধিপত্য ছিল জার্মানির। প্রথমার্ধে প্রায় ৭৮ শতাংশ বলের দখল ছিল তাদের। কিন্তু সেই আধিপত্য ছিল নিষ্ফলা। পাঁচটি শট নিয়েও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি ইউলিয়ান নাগেলসমানের দল। অন্যদিকে বলের দখলে পিছিয়ে থেকেও রক্ষণে দুর্দান্ত শৃঙ্খলা ধরে রাখে প্যারাগুয়ে। সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ওঠে। সেই কৌশলই ফল দেয় ৪২ মিনিটে, যখন ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রসে হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন হুলিও এন্সিসো। বিরতির পর জার্মানি আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং ৫৪ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে সমতা ফেরান কাই হাভার্টজ।
এরপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়েও জয়সূচক গোল আর বের করতে পারেনি চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অতিরিক্ত সময়ে জনাথন টাহর হেডে বল জালে গেলেও ভিএআরের মাধ্যমে সেটি বাতিল হয়, কারণ গোলের আগে গোলরক্ষক অরলান্দো হিলকে ফাউল করেছিলেন ভালডেমার আন্তন। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, আর সেখানেই নায়ক হয়ে ওঠেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরলান্দো হিল। প্রথমেই কাই হাভার্টজের শট ঠেকিয়ে দেন তিনি, পরে নিক ভল্টেমাডের শটও রুখে দেন। মাঝপথে আন্তোনিও সানাব্রিয়া ও ফাবিয়ান বালবুয়েনা গোল করতে ব্যর্থ হয়ে জার্মানিকে ফিরতে সুযোগ দিলেও সাডেন ডেথে জনাথন টাহ বল উড়িয়ে মারলে হোসে কানালে জয়সূচক গোল করে প্যারাগুয়েকে শেষ ষোলোয় তুলে দেন। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে প্রথমবার টাইব্রেকারে হারল জার্মানি। আগে চারবার টাইব্রেকারে খেলেই জিতেছিল তারা। জার্মানির সেই ‘অপরাজেয়’ মানসিক শক্তির ইতিহাস ভেঙে দিল প্যারাগুয়ে।
এই জয় প্যারাগুয়ের জন্য ছিল ঐতিহাসিক। ২০১০ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল তাদের সর্বোচ্চ অর্জন। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর বিশ্বকাপের বাইরে থাকা দলটি ফিরেই নকআউটে অন্যতম বড় চমক দেখাল। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আগের পাঁচ ম্যাচে কোনো গোলই করতে পারেনি তারা; সেই দীর্ঘ গোলখরা ভেঙে এবার শুধু গোলই করেনি, বিদায় করেছে বিশ্বকাপের অন্যতম সফল দল জার্মানিকে। কোচ গুস্তাভো আলফারোর দল পুরো ম্যাচে দেখিয়েছে অসাধারণ রক্ষণ, ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং সঠিক সময়ে আঘাত হানার ক্ষমতা। আধুনিক টুর্নামেন্ট ফুটবলে যে কৌশলগত শৃঙ্খলা কত বড় অস্ত্র, তারই উজ্জ্বল উদাহরণ এই জয়।
মেক্সিকোর মন্তেরেইতে দ্বিতীয় ম্যাচটিও ছিল একইরকম নাটকীয়। প্রথমার্ধে গোলশূন্য থাকার পর ৭২ মিনিটে কোডি গাকপোর গোলে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও মাঠে নেমে গোল করে আবেগাপ্লæত হয়ে পড়েন লিভারপুল ফরোয়ার্ড। ৯০ মিনিট পর্যন্ত জয় প্রায় নিশ্চিতই মনে হচ্ছিল ডাচদের। কিন্তু ফুটবলে শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কিছুই শেষ হয় না।
যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে তালবির নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে সমতা ফেরান ইসা দিয়োপ। ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই ডিফেন্ডারের এটি ছিল মরক্কোর জার্সিতে প্রথম গোল, আর সেটিই বদলে দেয় ম্যাচের ভাগ্য। অতিরিক্ত সময়েও একাধিকবার গোলের কাছাকাছি যায় মরক্কো- বিশেষ করে সুফিয়ান রাহিমির নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দেন ডাচ গোলরক্ষক বার্ট ভেরব্রুগেন। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য নির্ধারণে আসে টাইব্রেকার।
সেই টাইব্রেকার ছিল ভুলের মহড়া। দশটি শটের মাত্র পাঁচটি জালে যায়। নেদারল্যান্ডসের জাস্টিন ক্লাইভার্ট পোস্টে মারেন, জুরিয়েন টিম্বার বাইরে পাঠান, শেষ শটে ক্রেসেন্সিও সামারভিলের প্রচেষ্টা রুখে দেন ইয়াসিন বুনো। অন্যদিকে মরক্কোরও এল আয়নাউই ও আশরাফ হাকিমি গোল করতে পারেননি। কিন্তু শেষ শটে ইসমাইল সাইবারি ঠাণ্ডা মাথায় গোল করে আফ্রিকার দলটিকে শেষ ষোলোয় তুলে দেন। বিশ্বকাপে এটি ছিল নেদারল্যান্ডসের পঞ্চম টাইব্রেকার। এরমধ্যে চারবারই হারল তারা। টাইব্রেকার যেন ডাচদের পুরনো দুঃস্বপ্নই হয়ে থাকল।
দুই ম্যাচ মিলিয়ে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন গোলরক্ষকেরা। অরলান্দো হিল শুধু টাইব্রেকারে দুটি শট ঠেকাননি, ম্যাচেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন। ইয়াসিন বুনো আবার সামারভিলের শেষ শট রুখে মরক্কোকে জেতান। অন্যদিকে ম্যানুয়েল নয়ার ও বার্ট ভেরব্রুগেনও দুর্দান্ত খেলেছেন- নয়ার একটি পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন, ভেরব্রুগেন পুরো ম্যাচে একাধিক নিশ্চিত গোল বাঁচিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সতীর্থদের ব্যর্থতায় তাদের বীরত্ব মূল্যহীন হয়ে যায়।
দুটি ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই- আধিপত্য সবসময় জয় এনে দেয় না। জার্মানি বলের দখলে এগিয়ে থেকেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। নেদারল্যান্ডসও এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে ও মরক্কো দেখিয়েছে, আধুনিক নকআউট ফুটবলে শুধু বলের দখল নয়; রক্ষণ, ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং সুযোগকে কাজে লাগানোর দক্ষতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই রাত ইউরোপীয় ফুটবলের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে জার্মানির পতন যেন থামছেই না- ২০১৮ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০২২ সালেও গ্রুপেই শেষ, আর এবার গ্রুপ পেরোলেও প্রথম নকআউটেই বিদায়। নেদারল্যান্ডসও আবারো টাইব্রেকারের অভিশাপে হারল। এ দুটি হার শুধু দুটি দলের বিদায় নয়- এটি বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার দলগুলো এখন আর শুধু অংশ নিতে আসে না- তারা জিততেও আসে।
এই দুই অঘটনের ফলে নকআউটের সমীকরণও বদলে গেছে। প্যারাগুয়ে এখন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স অথবা সুইডেনের। মরক্কোর সামনে অপেক্ষা করছে কানাডা। এক রাতেই বিশ্বকাপের ব্র্যাকেট নতুন রূপ পেল। বিদায় নিল দুই ঐতিহ্যবাহী শক্তি, আর নতুন স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলল দুই আন্ডারডগ। বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবারই প্রমাণ করেছে- নাম নয়, শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় মাঠের পারফরম্যান্স, মানসিক দৃঢ়তা এবং সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা। সোমবার দিবাগত রাত ও মঙ্গলবার ভোরে প্যারাগুয়ে এবং মরক্কো সেই সত্যটিই আবারো নতুন করে লিখে দিল।
