টিকাদানে ঘাটতি থাকায় দীর্ঘায়িত হামের প্রকোপ
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার ৩ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো এ রোগের প্রকোপ কমেনি। প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে। হাম এবং অতি সংক্রামক এই রোগের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন অসংখ্য রোগী। প্রায় প্রতিদিনই হামে মৃতের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নাম।
মার্চ মাসে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ১২ এপ্রিল ৪টি সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী সর্বাত্মক টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এই টিকাদান কর্মসূচি শেষ হয় ২০ মে। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শেষ হলেও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশে হামের? টিকাদান কর্মসূচি চলমান।?
সরকারের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচি শতভাগ সফল দাবি করে আসলেও হামের সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী টিকাদানের ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসার কথা। কিন্তু টিকাদানের ৩ মাস পরও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা কমেনি, উল্টো আগের মতোই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, টিকা দেয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। সেই সময়টুকু দিতে হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী দাবি করেছিলেন জুন মাসের মধ্যেই হামের সংক্রমণ কমে আসবে। কিন্তু এখনো পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বরাবরই দেশের সবখানে ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছিলেন। তাদের মতে, হামের টিকার কাভারেজ দেশের সবখানে ৯৫ শতাংশ না হলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয় না। এটি না হলে সমস্যা দীর্ঘায়িত হবার শঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সেই বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে। হামের সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ধরনের গরমিল সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও বিভাগীয় পর্যায় মিলিয়ে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৮ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। গতকাল শনিবার পর্যন্ত যে সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে, তাতে এখনো ২ কোটি হয়নি। আর গত ২৮ জুন অনুষ্ঠিত ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই ২ লক্ষ্যমাত্রার ব্যবধান থেকে স্পষ্ট হয়, হামের টিকাদানে ৬০ লাখের বেশি শিশু বাদ পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে গুরুত্ব দেয়া হলেও হামের প্রকোপ ঠেকাতে টিকাদান কর্মসূচিতে একই মাত্রায় গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, হামের সংক্রমণ থামাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সাম্প্রতিক বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিরও পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা হয়নি। ফলে অনেক অভিভাবকই এ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে পারেননি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি এবং কম সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ তথ্য যথাযথভাবে পৌঁছায়নি। প্রতিদিন যদি প্রায় ১ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাহলে প্রতিদিনই মৃত্যুর ঝুঁকি থাকবে। মৃত্যু ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।
টিকা কার্যক্রম পরিচালনার পরও কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না- এ প্রসঙ্গে সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী ভোরের কাগজকে বলেন, আগে টিকাদান কর্মসূচির শুরুতে মাঠপর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রতিটি বাড়ি ও স্কুল থেকে তথ্য নেয়া হতো। সেই তথ্য সিভিল সার্জন হয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ ও ঢাকায় ইপিআইয়ের কাছে পৌঁছাত। সে অনুযায়ী টিকা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হতো। কিন্তু এবারের ক্যাম্পেইনে এর কোনোটিই করা হয়নি। ফলে ঠিক কী পরিমাণ শিশুকে টিকা দিতে হবে, তার সঠিক তথ্য না নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করায় ৩ মাসেও সংক্রমণ কমছে না। এখনো শত শত শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশুর প্রাণহানি ঘটছে।
তবে এই টিকা বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো টিকায়ই শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। একটি টিকা দিলে ৬০ বা ৭০ শতাংশ সুরক্ষা হয়।
দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হলে ৯৫ শতাংশ বা শতভাগ সুরক্ষা হয়। তাই সুরক্ষা নিশ্চিতে বয়স অনুযায়ী দ্বিতীয় ডোজ নেয়ার পরামর্শ তার।
টিকা ও ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রার ব্যবধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা করা হলো ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ২ কোটি ৪০ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ। আর হামের টিকার ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা কেন কম ধরা হলো? তাহলে বাকি শিশুরাতো এমনিতেই টিকার বাইরে থেকে গেল। সে অনুযায়ী টিকা কাভারেজের হার ৭০ শতাংশের মতো। অথচ ৯৫ শতাংশের নিচে হলে শিশুদের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়।
বিষয়টি সামনে আসার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাড়াতাড়ি করেই হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। প্রশাসনিকভাবে যে তথ্য-উপাত্ত ছিল, তা ধরেই ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। ওই সময় পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। মাঠপর্যায়ে গিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করার মতো যথেষ্ট সময় সরকারের হাতে ছিল না। তবে কোনো শিশু যাতে বাদ না যায় সেভাবেই করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা দেয়া হয়েছে। কীভাবে এমন পার্থক্য হলো, খতিয়ে দেখে জানাতে পারব।
তবে এক্ষেত্রে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদের বক্তব্য হলো, টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবার সময়ই তাড়াহুড়া না করে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে টিকা কার্যক্রম শুরুর পরামর্শ দেয়া হলেও সরকার তা কানে তোলেনি। কত শিশুকে টিকা দিতে হবে, সেই তথ্য ইপিআই থেকে ইউনিসেফ নিয়ে থাকে। ফলে এখানে পুরো দায়টা সরকারের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হেসেনের মতে, শুধু জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এখন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে হবে। যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দ্বিতীয় ডোজও নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হাম পোলিও ল্যাবের প্রধান ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ডা. খন্দকার মাহবুবা জামিল গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হাম পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য জুন মাসটা অপেক্ষা করতে হবে। তারপর সেল্ফ সার্ভে করতে হবে। সেল্ফ সার্ভে করলে বোঝা যাবে টিকা কতটা কার্যকর হয়েছে। হামের টিকার কার্যকারিতা জানতে মাঠ পর্যায়ে জরিপ শুরু করা হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
