আর্জেন্টিনার ঘাম ঝরানো জয়
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জন্য ম্যাচটি কাগজে-কলমে সহজ হওয়ার কথা ছিল। প্রতিপক্ষ আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে- মাত্র ছয় লাখ মানুষের দেশ, বিশ্বকাপে এবারই প্রথম অংশগ্রহণ। কিন্তু ফুটবল যে শুধু নাম, ইতিহাস কিংবা র্যাঙ্কিংয়ের খেলা নয়- সাহস, শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও বিশ্বাসেরও খেলা, সেটিই মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে নতুন করে প্রমাণ করে দিল কেপ ভার্দে। ৯০ মিনিট পর্যন্ত লিওনেল মেসিদের আটকে রেখে ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। শেষ পর্যন্ত ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা। তবে এই জয় যতটা স্বস্তির, তার চেয়ে বেশি সামনে এনে দিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণ ও মাঝমাঠের দুর্বলতা।
শুরু থেকেই বলের দখল ছিল আর্জেন্টিনার। প্রত্যাশামতো আক্রমণেও এগিয়ে ছিল স্কালোনির দল। তবে কেপ ভার্দে শুধু রক্ষণে খেলোয়াড় বাড়িয়ে বসে থাকেনি, সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠেছে। তাদের কমপ্যাক্ট ডিফেন্স, সংগঠিত প্রেসিং এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল আর্জেন্টিনার ছন্দ বারবার ভেঙে দেয়। ফলে বলের নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকলেও প্রথম আধাঘণ্টায় খুব বেশি পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেনি বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
অবশেষে ২৯ মিনিটে ম্যাচের প্রথম বড় মুহূর্তটি উপহার দেন লিওনেল মেসি। নিজেদের অর্ধ থেকে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের অসাধারণ লম্বা পাস নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে এগিয়ে আসা গোলরক্ষক ভোজিনহাকে পরাস্ত করেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। চলতি বিশ্বকাপে এটি তার সপ্তম গোল। একইসঙ্গে বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২০-এ। টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন তিনি। গোলের পাশাপাশি পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রায় প্রতিটি বিপজ্জনক আক্রমণের কেন্দ্রেও ছিলেন অধিনায়ক।
গোলের পর আর্জেন্টিনা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তভাবে নিজেদের দখলে নিলেও ব্যবধান বাড়াতে পারেনি। প্রথমার্ধের শেষ দিকে এনসো ফার্নান্দেজের জোরালো শট অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ভোজিনহা। পুরো ম্যাচেই কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক ছিলেন আর্জেন্টিনার জন্য এক অদম্য বাধা। মেসির শট, ফ্রি-কিক এবং আরো কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ ঠেকিয়ে দলকে বারবার ম্যাচে ফিরিয়ে রাখেন তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের গতি। ৫৯ মিনিটে রায়ান মেন্দেসের নিখুঁত পাস থেকে দেরয় দুয়ার্তে সমতায় ফেরান কেপ ভার্দেকে। মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের আবহ। গোল হজমের পর আর্জেন্টিনার খেলায় দেখা যায় অস্থিরতা। মাঝমাঠে সমন্বয় নষ্ট হয়ে যায়, পাসিংয়ে বাড়ে ভুল, আর প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খেতে থাকে রক্ষণভাগ। স্কালোনি একের পর এক পরিবর্তন আনলেও কাক্সিক্ষত ছন্দ ফিরছিল না। নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবারো পার্থক্য গড়ে দেন মেসি। তার কর্নার থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে লিসান্দ্রো মার্তিনেস বাঁ পায়ের জোরালো শটে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলটি উপহার দেন সিডনি লোপেস কাবরাল। বক্সের বাইরে থেকে দারুণ বাঁকানো শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে কোনো সুযোগই দেননি তিনি। দ্বিতীয়বারের মতো সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। তখন ম্যাচ ক্রমেই টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয় একটি সেট-পিস। ১১১ মিনিটে মেসির কর্নারে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার ডিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে জালে জড়ায়। পরে সেটিকে আত্মঘাতী গোল হিসেবে ঘোষণা করে ফিফা। শেষ মুহূর্তে কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এক হাতে ফিরিয়ে দিয়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেস নিশ্চিত করেন আর্জেন্টিনার স্বস্তির জয়।
তবে স্কোরলাইন যতই আর্জেন্টিনার পক্ষে থাকুক, এই ম্যাচ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য বড় এক সতর্কবার্তা। দুইবার এগিয়ে গিয়েও দুইবারই সমতায় ফিরতে হয়েছে তাদের। মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগের মাঝখানে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে, প্রেসিংয়ে ছিল অসামঞ্জস্য, আর প্রতিপক্ষের দ্রুত ট্রানজিশন বারবার বিপদ ডেকে এনেছে। ম্যাচ শেষে মেসিও আত্মসমালোচনা করে স্বীকার করেছেন, দল পরিকল্পনা অনুযায়ী চাপ তৈরি করতে পারেনি। প্রতিপক্ষের সেন্টারব্যাকদের চাপে ফেলতে গিয়ে মাঝমাঠ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, আর সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে কেপ ভার্দে। নকআউট পর্বে আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে তার মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
তবু আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসার নাম এখনো লিওনেল মেসি। ৪ ম্যাচে ৭ গোলের সঙ্গে যোগ হয়েছে দুটি অ্যাসিস্ট। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩ গোল, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ১ গোল, জর্ডানের বিপক্ষে ২ গোলের পর কেপ ভার্দের বিপক্ষেও গোল করার পাশাপাশি দুটি গোল তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বয়স যতই বাড়–ক, বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়ার সামর্থ্য যে এখনো অটুট, সেটি আবারো প্রমাণ করলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
অন্যদিকে হারলেও সম্মান জিতে নিয়েছে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপে অভিষেকেই স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে রুখে দিয়ে নকআউটে ওঠা দলটি এবার বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদেরও ৯০ মিনিটে জিততে দেয়নি। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সংগঠিত ফুটবল, আত্মবিশ্বাস আর লড়াকু মানসিকতায় তারা দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে ছোট দল বলে কিছু নেই। অনেক বড় দলও এই ম্যাচ দেখে কেপ ভার্দের পরিকল্পনা ও মানসিক দৃঢ়তা থেকে শিক্ষা নিতে পারবে।
শেষ পর্যন্ত স্কোরলাইনে লেখা থাকবে আর্জেন্টিনার ৩-২ জয়। ইতিহাসে যোগ হবে মেসির আরেকটি স্মরণীয় রাতও। কিন্তু এই ১২০ মিনিট শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জয়ের গল্প নয়। এটি কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য সাহসের গল্প, মেসির অনন্য নেতৃত্বের গল্প এবং একইসঙ্গে শিরোপা ধরে রাখার পথে আর্জেন্টিনার জন্য সময়মতো পাওয়া একটি কঠিন সতর্কবার্তার গল্প।
