×

প্রথম পাতা

ফ্রান্স-স্পেন

গতি বনাম ছন্দের লড়াই

Icon

মুহাম্মদ রুহুল আমিন

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গতি বনাম ছন্দের লড়াই

বিশ্বকাপের ফাইনালের আর মাত্র এক ধাপ দূরে। একটি জয়ই বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের গল্প। তাই আজ মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে স্পেন ও ফ্রান্স যখন মুখোমুখি হবে, তখন সেটি শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়; ফুটবল বিশ্বের চোখে এটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ লড়াইগুলোর একটি। দুই দলই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, দুই দলই শেষ কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। তাই কে ফাইনালে উঠবে আর কে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে বিদায় নেবে- সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মুখিয়ে আছে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী।

এই ম্যাচকে অনেকেই ‘ফাইনালের আগের ফাইনাল’ বলছেন। কারণ, টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দুই দলের মুখোমুখি লড়াই এটি। একদিকে ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, যারা গতি, শক্তি ও সরাসরি আক্রমণে প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন, যাদের শক্তি বলের নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, নিখুঁত পাসিং ও কৌশলগত ফুটবল। অর্থাৎ ডালাসে লড়াই হবে শুধু দুটি দলের নয়, দুটি ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও।

চলতি বিশ্বকাপে আক্রমণে সবচেয়ে ধারালো দলগুলোর একটি ফ্রান্স। ৬ ম্যাচে ১৬ গোল করে দিদিয়ের দেশঁমের দল বুঝিয়ে দিয়েছে, সুযোগ পেলেই তারা প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে জানে। কিলিয়ান এমবাপ্পের বিস্ফোরক গতি, উসমান দেম্বেলের ড্রিবলিং, মাইকেল ওলিসের সৃজনশীলতা এবং মাঝমাঠ থেকে অ্যাড্রিয়ান রাবিও ও অরেলিয়েন চুয়ামেনিদের সমর্থন ফরাসি আক্রমণকে ভয়ংকর করে তুলেছে। নকআউট পর্বেও অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়নি তাদের। প্রতিটি ম্যাচেই আক্রমণভাগ ছিল কার্যকর।

অন্যদিকে গোলের হিসেবে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণভাগ। ৬ ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। পাঁচটি ম্যাচেই ক্লিনশিট রেখেছে তারা। বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে দৌড় করানো, মাঝমাঠে জায়গা সংকুচিত করা এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণে ওঠাই স্পেনের কৌশল। রদ্রি, পেদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজদের নিয়ন্ত্রণে মাঝমাঠ প্রায় সব ম্যাচেই ছিল স্পেনের দখলে। সামনে লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস ও মিকেল ওইয়ারসাবাল মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন।

এই সেমিফাইনালের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- গতি জিতবে, নাকি কৌশল? ফ্রান্স চাইবে যত দ্রুত সম্ভব বল দখলে নিয়ে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের গতিকে কাজে লাগাতে। অন্যদিকে স্পেনের পরিকল্পনা হবে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ফরাসি আক্রমণকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ যে দল নেবে, ম্যাচের ছন্দও অনেকটাই তাদের দিকে ঝুঁকে যাবে।

সাম্প্রতিক ইতিহাস অবশ্য স্পেনকে কিছুটা এগিয়ে রাখছে। ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল স্প্যানিশরা। পরের বছর উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও গোলবন্যার ম্যাচে ৫-৪ ব্যবধানে জয় পায় তারা। ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো ফ্রান্সকে হারানোর লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে লা রোজা।

তবে অতীতের হিসাবকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নয় ফ্রান্স। দলটির ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা কোনাতে বলেছেন, স্পেনকে তারা সমীহ করে, কিন্তু ভয় পায় না। তার মতে, সেমিফাইনালে উঠে আসা প্রতিটি দলই বিশ্বসেরা। তাই প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের খেলাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও সতর্ক। তার মতে, বর্তমান ফরাসি দল আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিময় এবং আক্রমণাত্মক। তাই আগের ম্যাচগুলোর ফল দিয়ে এই লড়াই বিচার করা যাবে না। তবে নিজের দলের ফুটবল দর্শনে অটল তিনি। বলের নিয়ন্ত্রণ ও দলগত ছন্দ ধরে রাখতে পারলে ফাইনালের পথ খুলে যাবে বলেই বিশ্বাস স্পেন কোচের।

ম্যাচের আরেকটি বড় আকর্ষণ হবে তারকাদের ব্যক্তিগত লড়াই। এমবাপ্পেকে থামানোর দায়িত্ব থাকবে স্পেনের রক্ষণভাগের ওপর। আবার লামিন ইয়ামাল কিংবা ওইয়ারসাবালকে আটকে রাখতে হবে ফরাসি ডিফেন্ডারদের। বড় ম্যাচে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই অনেক সময় পার্থক্য গড়ে দেয়। একটি দৌড়, একটি নিখুঁত পাস কিংবা একটি দুর্দান্ত ফিনিশই বদলে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।

বিশ্বকাপ ও ইউরোর ইতিহাসেও দুই দলের লড়াই সমান আকর্ষণীয়। ১৯৮৪ ইউরোর ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতে ফ্রান্স। ২০০৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতেও জিদানের অনুপ্রেরণায় স্পেনকে হারিয়ে ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল ফরাসিরা। অন্যদিকে ২০১২ ইউরো, ২০২৪ ইউরো এবং ২০২৫ নেশনস লিগে জয় পেয়েছে স্পেন। ফলে ইতিহাসে যেমন পাল্টাপাল্টি সাফল্য রয়েছে, তেমনি বর্তমান ফর্মও দুই দলকে প্রায় সমান উচ্চতায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

এই ম্যাচে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বেঞ্চের শক্তি। দুই দলেরই এমন কয়েকজন ফুটবলার রয়েছেন, যারা বদলি হিসেবে নেমে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে শারীরিক সক্ষমতা, ম্যাচ ম্যানেজমেন্ট এবং কোচদের কৌশলগত সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিশ্বকাপের শেষ চার মানেই ভুলের সুযোগ খুব কম। একটি ভুল পাস, একটি রক্ষণভাগের সমন্বয়হীনতা কিংবা একটি স্থির বলের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য। তাই শুরু থেকেই দুই দলই সতর্ক ফুটবল খেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে ম্যাচ যত এগোবে, ততই বাড়বে আক্রমণের তীব্রতা।

ডালাসের এই লড়াই শুধু দুটি দেশের নয়; এটি ইউরোপীয় ফুটবলের আধিপত্য, দুই কোচের কৌশল, দুই ফুটবল দর্শন এবং বিশ্বের সেরা কয়েকজন ফুটবলারের সামর্থ্য প্রমাণের মঞ্চ। একজনের সামনে খুলে যাবে বিশ্বকাপ ফাইনালের দরজা, অন্যজনকে ফিরতে হবে অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে।

তাই কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি এখন ডালাসের দিকে। গতিময় ফ্রান্স, নাকি কৌশলী স্পেন- শেষ হাসি কার, তার উত্তর মিলবে আজ রাতেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিশ্বকাপের এই সেমিফাইনাল ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা উপভোগ্য লড়াই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

মিয়ানমারে সার ও সিমেন্ট পাচারকালে আটক ২২

মিয়ানমারে সার ও সিমেন্ট পাচারকালে আটক ২২

উজানের ঢলে বেড়েছে কর্ণফুলী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন

উজানের ঢলে বেড়েছে কর্ণফুলী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন

ডে কেয়ারে ১৩৬ শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগ

ডে কেয়ারে ১৩৬ শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ভাঙতে নতুন উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ভাঙতে নতুন উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App