সংঘাতের মাত্রা বাড়ছেই, আবারো জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন- জুলাই মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা ভেঙে ফের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এছাড়া ইরানের ওপর নতুন নৌ-অবরোধ এবং জাহাজ চলাচলে ফি আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে হামলা চালিয়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। এমনকি হোয়াইট হাউসের ভেতরে ঢুকেও ট্রাম্পের ক্ষতি করার হুমকি দিচ্ছে দেশটি। দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থানের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য।
মূলত ইরানে গত কয়েক রাত ধরে টানা হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রাতেও হামলা হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, দক্ষিণ বুশেহর প্রদেশের জাম, বুশেহর ও কানগানে হামলা হয়েছে। বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশের অমিদিয়েহ শহরেও হামলা হয়েছে। সেখানে চারজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইরানের হরমুজ প্রণালির কেশম, আবু মুসা ও কিশ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের কোনারাক ও চাবাহারেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলার জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও জর্ডান তাদের আকাশসীমায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
এছাড়া নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলার প্রতিবাদে হরমুজে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে ইরান। এরই ধারাবাহিকতায় হরমুজে ফের জ্বালানি তেলবাহী দুটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা। এতে একজন ক্রু নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো আটজন। গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইরানও এ হামলার কথা স্বীকার করেছে। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিবৃতির বরাতে তাসনিম সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দুটি সুপারট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসির বরাতে ইরানি সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, ‘বিপথগামী’ তেলবাহী ট্যাংকার দুটিকে নেভিগেশন-ব্যবস্থা বন্ধ রেখে ওমানের দক্ষিণাংশের পথ ধরে চলতে বলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্যাংকারগুলো বারবার ইরানের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে। পরে ‘আঘাত পেয়ে’ অচল হয়ে পড়ে।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ট্যাংকার ‘মোম্বাসা’ ও ‘আল বাহিয়াহ’-তে দুটি ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এ সময় ট্যাংকার দুটি ওমানের জলসীমায় হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের নৌপথ ধরে চলছিল। ইরানের হামলায় নিহত ক্রু ভারতীয় নাগরিক। আহত আটজনের মধ্যে চারজনের অবস্থা খুবই গুরুতর।’ এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে ইরান।
শুধুমাত্র হরমুজ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেই নিশানা করছে না ইরান, একই সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও চুক্তিবদ্ধ কর্মীদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন কোম্পানির মোবাইল নেটওয়ার্ক হ্যাক করেছে তেহরান। এক প্রতিবেদনে এমনটিই জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। মঙ্গলবার এ তথ্য জানায় সংবাদ মাধ্যমটি।
‘মোবাইল সারভেইলেন্স মনিটর’ নামের একটি সংস্থার গবেষণা প্রকল্পের টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত তথ্য এবং এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলেছে, ইরানের মোবাইল হ্যাকের এই তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কিন আইনপ্রণেতারা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে ওয়াশিংটন আবারো ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এ পদক্ষেপের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন করে আরো ৬০ দিনের সময় পাবে। এর আগে গত মে মাসে ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৭ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ায় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে প্রাথমিক অভিযানটি সমাপ্ত হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে আবার দুই দেশের মধ্যে হামলা শুরু হলে সেই যুদ্ধবিরতি এবং গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ভেস্তে যায়।
মূলত সম্প্রতি ট্রাম্পের যুদ্ধ করার ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টা করেছিল মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ। তাদের যুক্তি ছিল, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জন্য ট্রাম্প কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন নেননি। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ (যুদ্ধক্ষমতা আইন) অনুযায়ী, কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে সামরিক অভিযান শুরুর ৬০ দিন পর প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হয়।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর কথা জানালেন ট্রাম্প। এ ব্যাপারে গত শুক্রবার (১০ জুলাই) একটি চিঠিতে ট্রাম্প যুক্তি দেখিয়েছেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ওপর এ নতুন হামলা ‘দেশে এবং বিদেশে মার্কিন নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য’ তার দায়িত্বের অংশ।
সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, এখন থেকে হরমুজ প্রণালি ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ‘সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল’ আদায় করবে তারা। এ বিষয়ে ট্রাম্প আরো বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর আবারো অবরোধ কার্যকর করা হলো। ইরান বা দেশটির গ্রাহকদের কোনো জাহাজকে এ পথ দিয়ে চলাচল করতে দেয়া হবে না।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের পিকঅ্যাক্স পাহাড়েও হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। রহস্যময়ী এই পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে আছে ইরানের একটি পারমাণবিক কেন্দ্র। এটি ইরানের অন্যতম কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থাপনা। এই পারমাণবিক স্থাপনাটি সলিড গ্রানাইট পাথরের কয়েকশ মিটার গভীরে তৈরি করা হয়েছে। এ কারণে শক্তিশালী বোমা ফেললেও তার প্রভাব এটিতে পড়ে না।
সোমবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে হামলা চালাতে যাচ্ছি। ইরানিদের বলুন প্রস্তুত হতে। আমরা পিকঅ্যাক্সে খুব কাছ থেকে নজর রাখছি। যদিও সেখানে আমরা কোনো কার্যক্রম দেখছি না। তারা তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম ভালোভাবে চালাতে পারছে না। পিকঅ্যাক্সে আমরা সম্ভবত খুব শিগগিরই একটি হামলা চালাব।’
ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে উদ্দেশ্য করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘তাদের (ইরান) কোনো নৌবাহিনী নেই, কোনো বিমানবাহিনী নেই, সব শেষ। তাদের বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের সব নেতা নিহত হয়েছেন, তাদের সেরা নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। মোজতবা খামেনিও ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছেন।’
এমন আবহে আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার হোসেইন কানানি মোকাদ্দেম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। ইরানের সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট ফারারুকে তিনি বলেছেন, ‘উদ্দেশ্য যদি ট্রাম্পকে হত্যা করা হয়, তবে ইরান হোয়াইট হাউসের ভেতরেই তা সহজে করতে পারে। যখনই প্রয়োজন হবে, আমরা তা করার সক্ষমতা রাখি।’
এ হুমকির পাশাপাশি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান আলোচনা নিয়েও মন্তব্য করেন মোকাদ্দেম। তিনি জানান, ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তির জন্য শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি না। আমরা আলোচনা করছি উত্তেজনা কমানোর জন্য।’ তিনি আরো বলেন, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে এ আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো, ইরানের দাবিগুলো জোরালো করা এবং ওয়াশিংটনের তোলা বিভিন্ন অভিযোগের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা।’
ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৭ জুন সমঝোতা স্মারকে সইয়ের পর নতুন করে আলোচনার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তেলের বাজারে আবারো অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যারেল প্রতি তেলের দাম বেড়েই যাচ্ছে।
আল-জাজিরাকে কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পল মুসগ্রেভ বলেন, সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সবচেয়ে বড় সংঘাতে জড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনা যখন আশার আলো দেখাচ্ছিল, তখন হামলার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন যদি ইরান সমঝোতা স্মারক থেকে সরে যায়, তাহলে সংঘাত আরো বাড়তে পারে, যার পরিণতি ভালো হবে না।
